RESEARCH
গবেষণা এবং আল কুরআন
চিন্তা-ভাবনা-গবেষণার প্রতি উৎসাহিত করে মহান আল্লাহ তায়া'লা পবিত্র কুরআনে ফরমান:
٢٩- كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ ◯
“আমি আপনার নিকট বরকতময় কিতাব (আল কুরআন) নাযিল করেছি, যাতে করে তার আয়াতসমূহ নিয়ে তারা গবেষণা করে।” (সূরাহ ছা-দ: ২৯)
٨٢- أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّـهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
فَلَا “তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে না? উহা যদি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত তবে তারা তাতে অনেক মতপার্থক্য পেত।” (নিসা- ৮২)
আল কোরআন নিয়ে চিন্তা-গবেষণার গুরুত্ব
٢٤- أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَىٰ قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا ◯
أَفَلَতারা কি কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? নাকি তাদের অন্তরে তালা মেরে দেয়া হয়েছে?” (সূরা মুহাম্মাদ- ২৪)
‘তারা কি ভূপৃষ্ঠে ভ্রমণ করে না, যাতে তারা জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন হৃদয় ও শ্রুতিসম্পন্ন শ্রবণের অধিকারী হতে পারে! বস্তুত চক্ষু তো অন্ধ নয়, বরং অন্ধ হচ্ছে তাদের হৃদয়।’ (সূরা হজ : ৪৬)
‘তবে কি তারা লক্ষ্য করে না উটের প্রতি, কীভাবে তা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আকাশের প্রতি, কীভাবে তাকে উঁচু করা হয়েছে এবং পাহাড়সমূহের প্রতি, কীভাবে তাকে প্রথিত করা হয়েছে এবং ভূমির প্রতি, কীভাবে তা বিছানো হয়েছে’। (সূরা গাশিয়া ১৭-২০)
‘নিশ্চয়ই মহাকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টিতে এবং দিবা-রাত্রির আবর্তনের মধ্যে বোধসম্পন্ন লোকদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং মহাকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা-গবেষণা করে এবং বলে, হে
আমাদের প্রতিপালক! এ সবকিছু তুমি অনর্থক সৃষ্টি করনি। সব পবিত্রতা একমাত্র
তোমারই। আমাদের তুমি দোজখের শাস্তি হতে বাঁচাও। (সূরা আল-ইমরান ১৯০-৯১)
"ওয়াতিলকাল আমচালু নাদ্বরিবুহা-লিন্নাসি লায়া'ল্লাহুম ইয়াতাফাক্কারু—ন"।
অর্থঃ "মানুষের জন্য আমি এসব দৃষ্টান্ত এ জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা করে"।
ইসলামের
সত্যতা নিরূপণে এবং ঈমানের পরিপক্বতা অর্জনে পবিত্র কোরআন নিয়ে অব্যাহত
চিন্তাভাবনা-গবেষণার বিকল্প নেই। আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা কোরআন নিয়ে
চিন্তা-গবেষণা করার জন্য মানবকুলকে আহ্বান জানিয়েছেন।
ঙ) ইবনু আব্বাস (রা:) এর জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দুআ:
اللهم فقه في الدين وعلمه التأويل(( (رواه أحمد و ابن أبي شيبة وابن سعد والحاكم والطبراني في الكبير
“হে আল্লাহ তাকে দ্বীনের জ্ঞান দান কর এবং তা’বীল তথা কুরআনের তাফসীর শিক্ষা দান কর।” (আহমাদ, ইবনু আবী শায়বাহ,ইবনু সা’দ,হাকেম ও ত্বাবরানী কাবীর গ্রন্থে।)
গবেষণা ও চিন্তাচর্চায় আল কোরআনের অনুপ্রেরণা
সূরা আনফালে বলা হয়েছে: ‘আর তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না,যারা বলে যে, আমরা শুনেছি,অথচ তারা শোনে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলার নিকট সমস্ত প্রাণীর তুলনায় তারাই মূক ও বধির,যারা উপলব্ধি করে না।’(সূরা আনফাল : ২১, ২২)
:‘বল, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? (সূরা : আনআম : ৫০ )
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে নবী! বলে দাও, আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে, তার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করো।’ (সূরা ইউনুস, আয়াত ১০১)
প্রকৃতি নিয়ে, সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে, মহাজাগতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভেবে না দেখাকে আল্লাহ তায়ালা তিরস্কার করেছেন। কোরআনের ঘোষণা- 'তারা কি নিজেদের অন্তরে ভেবে দেখে না, আল্লাহ আসমান ও জমিন এবং এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুই যথাযথভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছেন। (সূরা রুম, আয়াত ৮)
[তাফসিরে মা'আরেফুল কোরআন ও ইবনে কাছির অবলম্বনে]
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ-
“এটি এক কল্যাণময় কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে তারা এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে” (ছোয়াদ ৩৮/২৯)।
َفَلاَ يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ اللهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلاَفًا كَثِيرًا-
“তারা কেন কুরআন নিয়ে গবেষণা করে না? যদি এটা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারু নিকট থেকে আসত, তাহ’লে তারা এর মধ্যে বহু গরমিল দেখতে পেত” (নিসা ৪/৮২)।
যারা কুরআন গবেষণা করেনা, তাদের প্রতি ধমক দিয়ে আল্লাহ বলেন,أَفَلاَ يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا- ‘তবে কি তারা কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে না? নাকি তাদের হৃদয়গুলি তালাবদ্ধ?’ (মুহাম্মাদ ৪৭/২৪)।
কুরআন অনুধাবনের মূলনীতি :
কুরআন অনুধাবনের প্রধান মূলনীতি হ’ল, কুরআনের যিনি বাহক, তাঁর বুঝ অনুযায়ী কুরআন অনুধাবন করা। অতঃপর তিনি যাদের কাছে কুরআন ব্যাখ্যা করেছেন, সেই ছাহাবীগণের বুঝ অনুযায়ী অনুধাবন করা। এর বাইরে ব্যাখ্যা দিতে গেলে পথভ্রষ্ট হবার সম্ভাবনা থেকে যাবে।
কুরআন অনুধাবনের গুরুত্ব :
কুরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্যই হ’ল তাকে বুঝা, অনুধাবন করা ও সে অনুযায়ী কাজ করা। শুধুমাত্র পাঠ করা ও মুখস্ত করা নয়। হাসান বাছরী (২১-১১০ হি./৬৪২-৭২৮ খৃ.) বলেন, আল্লাহর কসম! কুরআন অনুধাবনের অর্থ কেবল এর হরফগুলি হেফয করা এবং এর হুদূদ বা সীমারেখাগুলি বিনষ্ট করা নয়। যাতে একজন বলবে যে, সমস্ত কুরআন শেষ করেছি। অথচ তার চরিত্রে ও কর্মে কুরআন নেই’।[ইবনু কাছীর, তাফসীর সূরা ছোয়াদ ২৯ আয়াত।] তিনি বলতেন, কুরআন নাযিল হয়েছে তা বুঝার জন্য ও সে অনুযায়ী আমল করার জন্য। অতএব তোমরা তার তেলাওয়াতকে আমলে পরিণত কর’।[ ইবনুল ক্বাইয়িম, মাদারিজুস সালিকীন (বৈরূত : তাহকীক সহ দারুল কিতাবিল ‘আরাবী, ৩য় সংস্করণ ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খৃ.) ১/৪৫০।]
জ্যেষ্ঠ তাবেঈ মুহাম্মাদ বিন কা‘ব আল-কুরাযী বলেন, ফজর পর্যন্ত পুরা রাতে সূরা যিলযাল ও ক্বারে‘আহ পাঠ করা এবং তার বেশী পাঠ না করা আমার নিকটে অধিক প্রিয়, সারা রাত্রি কুরআন তেলাওয়াতের চাইতে’।[ আব্দুল্লাহ বিন মুবারক, আয-যুহ্দ (বৈরূত : দারুল কিতাবিল্ ইলমিয়াহ, তাহকীক : হাবীবুর রহমান আ‘যামী, তাবি) ক্রমিক ২৮৭, পৃ. ৯৭।] এর দ্বারা তিনি কুরআন অনুধাবনের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।
ইবনু জারীর ত্বাবারী (২২৪-৩১০ হি./৮৩৯-৯২৩ খৃ.) বলেন, কুরআন অনুধাবন অর্থ আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণসমূহ অনুধাবন করা, তাঁর বিধান সমূহ জানা, তাঁর উপদেশ সমূহ গ্রহণ করা ও সে অনুযায়ী আমল করা’।[ইবনু জারীর, তাফসীর ত্বাবারী সূরা ছোয়াদ ২৯ আয়াত।]
সৈয়ূতী (৮৪৯-৯১১ হি./১৪৪৫-১৫০৫ খৃ.) বলেন, কুরআন অনুধাবন করাটাই হ’ল মূল উদ্দেশ্য। কেননা কুরআনই হবে কর্মপদ্ধতি ও আচরণে পথ প্রদর্শক। এর মাধ্যমেই মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে সর্বোচ্চ স্থান লাভ করবে’।[সৈয়ূত্বী, আল-ইতক্বান (মিসর : আল-হাইআতুল মিছরিইয়াহ, ১৩৯৪/১৯৭৪) ১/৩৬৮।]
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,إِنَّ اللهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا وَيَضَعُ بِهِ آخَرِينَ- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ এই কিতাবের মাধ্যমে বহু সম্প্রদায়কে উঁচু করেন ও অনেককে নীচু করেন’।[ মুসলিম হা/৮১৭; মিশকাত হা/২১১৫।] কুরআনের অনুধাবনকারী ও আমলকারীদের পরকালীন উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে নাউওয়াস বিন সাম‘আন (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, ক্বিয়ামতের দিন কুরআন ও তার বাহককে আনা হবে। যারা তার উপর আমল করেছিল। যাদের সম্মুখে থাকবে সূরা বাক্বারাহ ও আলে ইমরান। সে দু’টি হবে মেঘমালা সদৃশ। যার মধ্যে থাকবে চমক’।[মুসলিম হা/৮০৫; মিশকাত হা/২১২১।]
Comments
Post a Comment