অতিপারমাণবিক জগতের তত্ত্ব কথাThe theory of the superatomic world

 

  • অতিপারমাণবিক জগতের তত্ত্ব কথাThe theory of the superatomic world

Chief Editor at Islamic Science-Tech Review

January 11, 2icles022

অতিপারমাণবিক জগতের কিছু তত্ত্ব কথা

-মুহাম্মাদ শেখ রমজান হোসেন, সম্পাদক, ইষ্টার্ণ সায়েন্স-টেক রিভিউ

মহাবিশ্বের পারমাণবিক অবস্থান

মহাবিশ্বের সংঙ্গে আমাদের পরিচয় দৃশ্যমান বস্তুর আঙ্গিকে। পরমাণু ও পরমাণু দ্বারা গঠিত যৌগ বস্তু/পদার্থ দিয়ে এই দৃশ্যমান বিশ্ব গঠিত।

গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস ঈসাব্দপূর্ব ৪০০ অব্দে সর্বপ্রথম পদার্থের ক্ষুদ্রতম বস্তু ‘কণা’ (atom) নিয়ে মতবাদ পোষণ করেন। গ্রীক ‘অ্যাটোমাস’ (atomas) শব্দ থেকে এটম (atom) শব্দটির বুৎপত্তি- যার অর্থ আর ভাঙা যাবে না অর্থাৎ এটম অবিভাজ্য। পরবর্তীতে মধ্যযুগে জাবির ইবনে হাইয়ান আল আরাবি ডেমোক্রিটাসের এটম-কে যথাক্রমে ১. আব, ২. আতস, ৩. খাক, এবং বাত-বস্তু/পদার্থের এই চতুর্মাত্রিক রূপ দান করেন।

পক্ষান্তরে অ্যারিষ্টটলের মতে, পদার্থসমূহ নিরবচ্ছিন্ন (continuous) একে যতই ভাঙ্গা হোক না কেন, পদার্থের কণাগুলো ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর হতে থাকবে। বিজ্ঞানী রাদার ফোর্ড তার পরীক্ষালব্ধ ফলাফল থেকে বলেন যে, পরমাণু হলো ধনাত্মক আধান ও ভর একটি ক্ষুদ্র জায়গায় আবদ্ধ’। তিনি এর নাম দেন ‘নিউক্লিয়াস’। প্রোটন ও ইলেকট্রন নিয়ে গঠিত হয় পরমাণু কেন্দ্র-এই কেন্দ্রকে বলা হয় নিউক্লিয়ার্স। নিউক্লিয়ার্স এর চার পাশে ঘুরতে থাকে পরমাণুর ইলেকট্রন।

সৃষ্টি তত্ত্ব বিষয়ক STANDARD MODEL

পদার্থ বিদ্যার যে তত্ত্বটির সাহায্যে কোন বস্তুর ভরের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয় তাকে “ষ্ট্যান্ডার্ড মডেল” (Standard Model)বলা হয়। এই ষ্ট্যান্ডার্ড মডেলটি অস্তিত্বশীল হতে হলে প্রয়োজন পড়ে এমন এক অতি পারমাণবিক কণা- যার বৈজ্ঞানিক নাম “হিগস-বোসন কণা” বা God’s particle। পদার্থ বিদ্যার এই ষ্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর ভর সৃষ্টির প্রাথমিক ভিত্তি হচ্ছে একটি “অদৃশ্য কণা”। বস্তুর ভরের মধ্যে ভিন্নতার কারণও এই অদৃশ্য কণাটিই। পদার্থের ভর কিভাবে তৈরি হয় তা জানতে ১৯৬৪ সাল থেকে শুরু হয় গবেষণা। ২০০১ সালে এসে গবেষকরা যুক্তরাষ্ট্রের ফার্মিল্যাবের "টেভাট্টন" নামক যন্ত্ররে মাধ্যমে ওই কণার খোঁজ করতে শুরু করেন। এ কণার খোঁজে ২০০৮ সালে প্রতিযোগিতায় নামেন CERNএর খ্যাতনামা গবেষকরা। ২০১১ সালে CERNএর বিজ্ঞানীরা এ কণার প্রাথমিক অস্তিত্ব টের পান।

আধুনিক বৈজ্ঞানিক সৃষ্টিতত্ত্ব ভিত্তিক মহাবিশ্বের জন্মোতিহাস।

বর্তমান বিজ্ঞান মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব বিষয়ে তথ্য দিতে গিয়ে মানবজাতিকে এ মর্মে অবহিত করেছে যে, প্রায় ১৫০০ কোটি বৎসর পূর্বে কোন এক মহা আলোক শক্তির মহাউৎস হতে উৎসারিত হয়ে অদৃশ্য প্রায় মহাসূক্ষ্ম বিন্দু 10-33cm. আকার ধারণ করে হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশন নামক বিপুল পরিমাণ আলোক শক্তি মহাসঙ্কোচনের মাধ্যমে সংকুচিত হয়ে প্রায় ১০,০০০ কোটি কোটি কোটি কোটি ডিগ্রি কেলভীন (K) তাপমাত্রা লাভ করে মাত্র 10-43sec. অর্থাৎ এক সেকেন্ডের ১০ কোটি, কোটি কোটি কোটি কোটি ভাগের মাত্র এক ভাগকাল সময়ের মধ্যে মহাবিস্ফোরণ Big Bang) এর মাধ্যমে এ মহাবিশ্বের সূচনাকাল শুরু হয়Big Bang মতবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ঐ মতবাদ গবেষণাকারী বিজ্ঞানীগণ Computer simulation'-এর মাধ্যমে ব্যাপক গবেষণা করে সিদ্ধান্ত দেন যে, মূলতঃ highest energetic radiation' তথা কল্পনাতীত শক্তিশালী মহা আলোর গোলক। ‘আলোকশক্তিই প্রথমে ঘনীভূত হয়ে মহা বিন্দুতে প্রবেশ করে এবং পরবতা মুহুতে সেই বিন্দুটি মহাবিস্ফোরণ ঘটিয়ে ক্রমান্বয়ে এ মহাবিশ্বে রূপ নেয়। বিস্ফোরণের পর। মুহূর্তে আলোর কণা ফোটন' (Photon) ছাড়া কোনাে কিছুর অস্তিত্বই ছিলো না ।

অপরদিকে বিজ্ঞানীগণ ইউরোপ এবং আমেরিকায় ‘Particales Collider'-এ পদার্থকে ভেঙ্গে অণু, অণুকে ভেঙ্গে পরমাণু, পরমাণুকে ভেঙ্গে ইলেকট্রন, প্রোটন ও নিউট্রন এবং প্রোটন ও নিউট্রনকে ভেঙ্গে কোয়ার্ক, অবশেষে কোয়ার্ককে ধ্বংস করে আলোর কণা ফোটন'কে সনাক্ত করে প্রমাণ করেন যে, এ মহাবিশ্বের সৃষ্টির পেছনে মৌলিক যে শক্তিটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা মূলতঃই মহাশক্তিশালী এক প্রকার নূর’ বা ‘আলোকশক্তি যার বৈজ্ঞানিক নাম Highest Energetic Radiation (HER) । Highest Energetic Radiation (HER)-এর মধ্যে অআসমান-জমিনের (আকাশ-গ্রহ-নক্ষত্র-পৃথিবী ইত্যাদির ) বীজ নিহিত ছিল যা বিস্ফোরণের মাধ্যমে পৃথক হয়ে যায়।এই বিস্ফোরণকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ বলা হয়।

মহাবিস্ফোরণ ( বিগ ব্যাং) উত্তর মহাবিশ্বের স্বরূপ

প্ল্যাঙ্কীয় যুগ (প্ল্যাঙ্ক এপক)

মহাবিশ্বের একেবারে শুরুর সময়কালটিকে বলা হয় প্ল্যাঙ্ক এপক বা প্ল্যাঙ্ক যুগ। বিগ ব্যাংয়ের ঠিক পর থেকে এর ব্যাপ্তি মাত্র ১০-৪৩ সেকেন্ড। শূন্যের পর দশমিক দিয়ে ৪৩টি শূন্য দেওয়ার পর ১ লিখলে যে সংখ্যা পাওয়া যায়, সংখ্যাটি তার সমান। বর্তমান বিজ্ঞান এ সময়ের মহাবিশ্বের খবর ভালো করে বলতে পারে না। আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিকতা বলছে, এ সময়ের আগে একটি মহাকর্ষীয় সিঙ্গুলারিটির অস্তিত্ব ছিল। মনে করা হয়, এ সময়ে প্রকৃতির চারটি মৌলিক বল—মহাকর্ষ, তড়িৎ–চুম্বকত্ব এবং সবল ও দুর্বল নিউক্লীয় বল একীভূত ছিল। এমনকি এদের শক্তিও ছিল একই মাত্রার। যদিও বর্তমানে মহাকর্ষ অন্যদের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত রকম দুর্বল। এটি সবল বলের চেয়ে ১০৩৮ গুণ ও তড়িৎ–চুম্বকীয় বলের চেয়ে ১০৩৬ গুণ দুর্বল। প্ল্যাঙ্ক যুগে মহাবিশ্ব বিস্তৃত ছিল মাত্র ১০-৩৫ মিটার অঞ্চলজুড়ে। এই সংখ্যাটিকে বলা হয় প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য। তবে সাইজ ছোট থাকলে এ সময় তাপমাত্রা ছিল বিশাল। ১০৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের এককের মতোই এরও নাম প্ল্যাঙ্ক তাপমাত্রা। আর হ্যাঁ, এ সময়কালটির নামও প্ল্যাঙ্ক সময়।

মহা একীভবন যুগ

পরের যুগের নাম মহা একীভবন যুগ । ব্যাপ্তি বিগ ব্যাংয়ের পরের ১০-৪৩ থেকে ১০-৩৬ সেকেন্ড। এ সময় মহাকর্ষ অন্য তিনটি মৌলিক বল থেকে আলাদা হয়ে যায়। এ জন্যই এ বল তিনটির একীভূত তত্ত্বকে মহা একীভবন তত্ত্ব বলা হয়।

স্ফীতি যুগ

মহা একীভবন যুগ এর পরপরই শুরু স্ফীতি যুগের। এ যুগেই সামান্য পরিমাণ সময়ের মধ্যে মহাবিশ্ব ১০২৬ গুণ বড় হয়ে যায়। ১ ন্যানোমিটার দৈর্ঘ্যের কোনো বস্তুকে এত বড় করলে সেটা ১০ দশমিক ৬ আলোকবর্ষ পরিমাণ লম্বা হবে। এ হিসাবটি অবশ্য পাওয়া যায় রৈখিক মাপকাঠিতে হিসাব করলে। আয়তনের দিক থেকে হিসাব করলে সাইজ বেড়েছিল ১০৭৮ গুণ অর্থাৎ মাত্র ১০ সেমি। বিগ ব্যাংয়ের ১০-৩২ সেকেন্ড পরই এ যুগের পরিসমাপ্তি ঘটে।

তড়িৎ দুর্বল যুগ

স্ফীতি যুগের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছিল তড়িৎ দুর্বল যুগের যার ব্যাপ্তিকাল ১০-১২ সেকেন্ড পর্যন্ত। এ সময় সবল বল আলাদা হয়ে গেল। একত্রে থাকল শুধু দুর্বল নিউক্লীয় বল এবং তড়িৎ-চুম্বকীয় বল। সৃষ্টি হয় ডব্লিউ, জেড ও হিগস বোসনদের মতো ব্যতিক্রমী কণিকা।

কোয়ার্ক যুগ

১০-১২ সেকেন্ডের পর শুরু কোয়ার্ক যুগ। এ সময়কালে বিপুল পরিমাণ কোয়ার্ক, ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো তৈরি হয়। কোয়ার্ক হলো প্রোটন ও নিউট্রনের গাঠনিক কণা। মহাবিশ্ব আরেকটু ঠান্ডা হলো। নামল ১০ কোয়াড্রিলিয়ন ডিগ্রির (১-এর পর ১৬টি শূন্য বসিয়ে যে সংখ্যা পাবেন) নিচে। তবে সবচেয়ে উল্লেযোগ্য ঘটনা হলো, চারটি মৌলিক বল সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেল। ঠিক বর্তমানে যেভাবে আছে।

জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্ট

কোয়ার্কের সঙ্গে সঙ্গে এদের প্রতিকণা অ্যান্টিকোয়ার্ক বা প্রতিকোয়ার্কও তৈরি হচ্ছিল। তবে কণা ও প্রতিকণার দুটোরই সাক্ষাৎ ডেকে আনে মৃত্যু। কিন্তু আবার কোয়ার্ক বেঁচে না থাকলে তো পদার্থ তৈরি সম্ভব নয়। সম্ভব নয় গ্রহ, নক্ষত্রের সৃষ্টি। ফলে মানুষসহ কোনো প্রাণীও জন্ম নিত না মহাবিশ্বে। তাহলে হয়েছিল কীভাবে? কোয়ার্ককে বাঁচিয়ে রাখতে তাই বিশ্ব প্রকৃতিতে জরুরী হয়ে দেখা দিয়েছিল কোয়ার্ক ত্রাণকর্তার ভূমিকা পালনকারী একটি প্রাকৃতিক সত্বার। কোয়ার্ককে বাঁচাতে তাই হঠাৎ আবির্ভূত হয় একটি প্রক্রিয়া যার বৈজ্ঞানিক নাম “ব্যারিওজেনেসিস”। ব্যারিওজেনেসিস নামের একটি প্রক্রিয়া এ সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ প্রক্রিয়ায় প্রতি বিলিয়ন জোড়া কোয়ার্ক-প্রতিকোয়ার্ক থেকে একটি করে কোয়ার্ক বেঁচে যায়।  যেমন বিলিয়ন বিলিয়ন স্পার্ম থেকে মাত্র একটি স্পার্ম বেঁচে থেকে ওভামের সাথে মিলিত হয়ে মানব ভ্রণের বিকাশ ঘটায়। আর এ বেঁচে যাওয়া কোয়ার্করাই পরবর্তী মহাবিশ্বের পদার্থ তৈরির ক্রীড়নক।

হ্যাড্রোন যুগঃ সুবিন্যস্ত, সুশৃঙ্খল, অভিন্ন প্রাকৃতিক সুষম যুগ

হ্যাড্রোন যুগের এ সময়টিতে মহাবিশ্বে একটা স্থির নিয়ম বলবৎ ছিল। তখন মহাবিশ্বের সামগ্রিক শক্তি ও চার্জ ছিল সংরক্ষিত যার স্থায়িত্ব ছিল ১ সেকেন্ড থেকে মিনিট কয়েক পর্যন্ত। কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত যৌগিক কণিকার নাম হ্যাড্রোন। হ্যাড্রোন কণিকাদের মধ্যে আমাদের সবচেয়ে পরিচিত হলো প্রোটন ও নিউউল্লেখ্য, প্রোটন, নিউট্রন ৩টি কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত যার একক নাম ব্যারিয়ন আর পায়ন ২টি কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত যার একক নাম মেসন। আর ব্যারিয়ন+মেসন মিলে গঠিত হয় হ্যাড্রন কণা পরি হ্যাড্রোন যুগে মহাবিশ্বের তাপমাত্রা আরেকটু কমে এক লাখ কোটি ডিগ্রি হলো। ফলে কোয়ার্করা যুক্ত হয়ে হ্যাড্রোন গঠিত হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ পেল। পাশাপাশি ইলেকট্রন ও প্রোটনের সংঘর্ষে তৈরি হয় নিউট্রন ও নিউট্রিনো। এই নিউট্রিনো কণারা আজ পর্যন্ত মহাবিশ্বজুড়ে ছুটে চলেছে আলোর কাছাকাছি বেগে।

লেপটন যুগ

হ্যাড্রোন পরবর্তী যুগের নাম লেপটন যুগ। এ যুগে পূর্ববর্তী অল্প কিছু ছাড়া প্রায় সব হ্যাড্রোন ও প্রতি–হ্যাড্রোন নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে মহাবিশ্বে চলছিল লেপটন ও প্রতি–লেপটনদের (যেমন ইলেকট্রনের প্রতিকণা প্রতি–ইলেকট্রন) রাজ-রাজত্ব। এ দুই বিপরীত চার্জধারী কণার মিলনে অবমুক্ত হয় শক্তি। এ শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটে ফোটনের (আলোর কণিকা) মাধ্যমে। উল্টোভাবে ফোটনরাও আবার মিলিত হয়ে ইলেকট্রন-পজিট্রন জোড় তৈরি করতে থাকে। মহাবিশ্বের প্রথম ৩ মিনিট সময়কালের এখানেই সমাপ্তি ঘটে। এরপর থেকে সময়ের ব্যবধান দাঁড়ায় বিশাল মাপকাঠিতে। এরপর বিশ্ব সংগঠনে প্রকৃতি সময় নেয় অন্ততঃ ১৭ মিনিট যা ছিল অতীব জরুরী এবং গুরুত্বপূর্ণ সময়-পর্ব। এতে সংঘটিত হয় গুরুত্বপূর্ণ নিউক্লীয় সংশ্লেষণ। এটি হলো নতুন পরমাণুর নিউক্লিয়াস (কেন্দ্র) তৈরির প্রক্রিয়ার নাম। প্রোটন ও নিউট্রন ফিউশন বিক্রিয়ার মাধ্যমে মিলিত হয়ে তৈরি করে এ নতুন পরমাণু। এভাবেই গড়ে ওঠে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও লিথিয়ামের মতো পর্যায় সারণির প্রথম দিকের মৌলগুলো। এ অবস্থায় মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ১০০ কোটি ডিগ্রি। কিন্তু এ সময়ের পরই তাপমাত্রা ও ঘনত্ব এত বেশি কমে গেল যে, নিউক্লীয় ফিউশনে সাময়িক বিরতি ঘটেছিল। এই ফিউশন পরবর্তী সময়ে আবার শুরু হয়। তবে সেটা সমগ্র মহাবিশ্বে নয়।

ফোটন এপক যুগ

এবারের যুগের নাম ফোটন এপক। তখন মহাবিশ্বে চলছিল বিকিরণের আধিপত্য। পরমাণুর নিউক্লিয়াস ও ইলেকট্রনের উত্তপ্ত স্যুপে গড়া প্লাজমা দিয়ে মহাবিশ্ব তখন ভর্তি। বিকিরণের আধিপত্য থাকার কারণে অধিকাংশ লেপটন ও প্রতি–লেপটন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ফলে মহাবিশ্বজুড়ে তখন ছিল ফোটনের ছড়াছড়ি। আর ফোটন মানেই বিকিরণ।  আমাদের পারিপার্শ্বিক দৃশ্যমান আলোও একধরনের বিকিরণ। ফোটন যুগের ফোটনরা লেপটন যুগে বেঁচে যাওয়া প্রোটন, ইলেকট্রন ও পরমাণুকেন্দ্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে থাকে। এ যুগের স্থায়িত্ব ৩ মিনিট থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার বছর।

কসমোলজিক্যাল রিকম্বিনেশন বা মহাজাগতিক পুনর্গঠন যুগ

এরপর উদ্ভব ঘটে কসমোলজিক্যাল রিকম্বিনেশন বা মহাকাশীয় পুনর্গঠন যুগ। এটি ছিল বিশ্ব জগতে এক ঐতিহাসিক যুগ সন্ধিক্ষণ। এ যুগে হঠাৎ করে তাপমাত্রা সূর্যের পৃষ্ঠ তাপমাত্রার কাছাকাছি ৩০০০ ডিগ্রি নেমে গিয়ে সৃষ্টি হয় রিকম্বিনেশন বা পুনর্গঠন যুগ। এ সময় আয়নিত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম নিউক্লিয়াস ইলেকট্রনের সঙ্গে সন্ধি করে ফেলে। ফলে কেন্দ্রে প্রোটন ও কক্ষপথে ইলেকট্রন নিয়ে পরিপূর্ণ পরমাণু তৈরি হয়ে যায়। এ প্রক্রিয়ারই নাম রিকম্বিনেশন।  মহাবিশ্বের প্রায় ৭৫ শতাংশ হাইড্রোজেন ও ২৫ শতাংশ হিলিয়াম—এই অনুপাতটি এ কালের শেষের দিকেই তৈরি হয়।

ডার্ক এরা বা অন্ধকার যুগ

রিকম্বিনেশন যুগের পর থেকে ১৫ কোটি বছর পর্যন্ত সময়কালকে বলে অন্ধকার যুগ (Dark Era) বলা হয়। যুগটি হলো পরমাণু তৈরির পরের ও নক্ষত্রের জন্মের আগের সময়কাল। ফোটনের অস্তিত্ব থাকলেও নক্ষত্রের জন্ম না হওয়ায় এক অর্থে মহাবিশ্ব অন্ধকারই বটে। রহস্যময় ডার্ক ম্যাটারই এ সময় মহাবিশ্বে রাজত্ব করত বলে ধারণা কর

পুনঃ আয়নীকরণ যুগ

এরপর শুরু হলো পুনঃ আয়নীকরণ। মহাকর্ষের আকর্ষণে প্রথম কোয়াসার তৈরি হলো। অন্যদিকে মহাবিশ্ব আবার প্রশম অবস্থা থেকে আয়নিত অবস্থায় চলে গেল। এ যুগটির ব্যাপ্তি বিগ ব্যাং-পরবর্তী ১৫ থেকে ১০০ কোটি বছর।

 নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির জন্মপ্রক্রিয়া

পুনঃ আয়নীকরণ যুগের পরের ৩০ থেকে ৫০ কোটি বছর ধরে চলল নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির জন্মপ্রক্রিয়া, যা পরে চলতেই থাকল। মহাবিশ্ব প্রসারণের পাশাপাশি মহাকর্ষের প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলের গ্যাস ঘনীভূত হতে হতে জন্ম হয় এসব নক্ষত্র। প্রথম দিকে জন্ম নেওয়া নক্ষত্ররা ছিল বিশাল বড় বড়। সূর্যের প্রায় এক শ গুণ ভারী। এদের আয়ু অবশ্য কম হতো। সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে ঘটত এদের মৃত্যু। একটি ক্ষুদ্র কেন্দ্রীয় অংশ অবশিষ্ট থাকত। বাকি পদার্থ বিস্ফোরণের ধাক্কায় ছিটকে যেত বাইরে- যা ছিল নতুন নক্ষত্র তৈরির উপাদান। নক্ষত্র তৈরির এ চক্রটি কিন্তু আজও চলমান।

চেনা-জানা জগতের জন্ম কথা

আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর আগেবিগ ব্যাংয়ের ৮৫০ থেকে ৯০০ কোটি বছর পর আমাদের সূর্য নক্ষত্রের ছুড়ে দেওয়া পদার্থ থেকে জন্ম নিয়েছিল। আর পৃথিবীর জন্ম প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে। তীব্র বেগে প্রসারণ ও চক্রাকারে নক্ষত্রের জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মহাবিশ্ব এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে, মহাকালের দিকে। সেই কালের শেষে ঠিক কী আছে, তা ঠিক করে জানা নেই উল্লেখ্য, ১৯১৫ সালে বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব উপস্থাপনের পর থেকেই মূলত ভৌত বিশ্বতত্ত্ব একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য এবং সুনির্দিষ্ট নীতিমালাবিশিষ্ট বিজ্ঞান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। ফ্রিডম্যান-Lemaître-রবার্টসন-ওয়াকার বিশ্বতত্ত্বের যৌথ ব্যাখ্যামতে, এই মহাবিশ্ব প্রসারিত বা সংকুচিত হতে পারে। (সূত্রঃ উইকিপিডিয়াবিশ্ব জগত আইনগতভাবে কার্যত: দু' ভাগে বিভক্ত। ১) স্থূল জাগতিক আইন ২) সূক্ষ্ণ জাগতিক আইন। ১. স্থূল জাগতিক আইন: স্থূল জাগতিক আইন নিউটনীয় বলবিদ্যার অনেকটা অনুকূল। ২. সূক্ষ্ণ জাগতিক আইন: আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের অনুকূল।বর্তমান বিশ্বতত্ত্বের মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের বর্তমান বয়স ১৩.৭৫ বিলিয়ন বা ১,৩৭৫ কোটি বছর। এই মহাবিশ্বের দৃশ্যমান অংশের "এই মুহূর্তের" ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোক বছর। মহাবিশ্বের ব্যাস ১৩.৭৫ x ২ = ২৭.৫০ বিলিয়ন আলোক বছরের চাইতে বেশী। তাছাড়া, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে মহাবিশ্বকে যদি একটা গোলক কল্পনা করা হয় তবে তার ব্যাসার্ধ হবে প্রায় ৪৬ বিলিয়ন আলোক বর্ষ। জ্যোতির্বিদরা মনে করছেন দৃশ্যমান মহাবিশ্বে প্রায় ১০০ বিলিয়ন গ্যালাক্সি আছে। এই গ্যালাক্সিরা খুব ছোটও হতে পারে, যেমন মাত্র ১০ মিলিয়ন (বা ১ কোটি) তারা সম্বলিত বামন গ্যালাক্সি অথবা খুব বড়ও হতে পারে, যেমনঃ দৈত্যাকার গ্যালাক্সিগুলিতে ১০০০ বিলিয়ন তারা থাকতে পারে । মহাবিশ্বের গঠন ও আকার আমাদের গ্যালাক্সি-ছায়াপথ সূর্য থেকে গ্যালাক্সির কেন্দ্রের দূরত্ব প্রায় ৩০,০০০ আলোক বর্ষ। গ্যালাক্সির ব্যাস ১০০,০০০ বা এক লক্ষ আলোক বর্ষ। স্থানীয় গ্যালাক্সিপুঞ্জ আমাদের ছায়াপথের ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লক্ষ আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত স্থানীয় গ্যালাক্সিগুলো। এই স্থানীয় গ্যালাক্সি দলের মধ্যে বড় তিনটি সর্পিল গ্যালাক্সি - ছায়াপথ, অ্যান্ড্রোমিডা বা M31 এবং M33 একটি মহাকর্ষীয় ত্রিভুজ তৈরি করেছে। অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি আমাদের নিকটবর্তী বড় গ্যালাক্সি। এর দূরত্ব হচ্ছে ২.৫ মিলিয়ন বা ২৫ লক্ষ আলোকবর্ষ। স্থানীয় গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জ স্থানীয় গ্যালাক্সি দল থেকে স্থানীয় গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জের অন্যান্য দলের দূরত্ত্ব বিদ্যমান। এই মহাপুঞ্জের কেন্দ্র কন্যা গ্যালাক্সি দল হওয়াতে তাকে কন্যা মহাপুঞ্জ বা মহাদল বলা হয়। কন্যা গ্যালাক্সি পুঞ্জ আমাদের থেকে প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বা ৬.৫ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। এই ধরণের মহাপুঞ্জগুলো ফিতার আকারের মত। সাবানের বুদবুদ দিয়ে এই ধরণের গ্যালাক্সিপুঞ্জ গঠনের মডেল করা যায়। দুটো বুদবুদের দেওয়াল যেখানে মেশে সেখানেই যেন গ্যালাক্সির ফিতা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি আলোকবর্ষের মধ্যে অবস্থিত প্রধান গ্যালাক্সিপুঞ্জ ও গ্যালাক্সি দেওয়াল রয়েছে। কন্যা গ্যালাক্সি মহাপুঞ্জসহ ৫০ মেগাপার্সেকের (৫০ মিলিয়ন পার্সেক বা ১৬৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ)মধ্যে সমস্ত পদার্থ ৬৫ মেগাপার্সেক দূরের গ্যালাক্সি পুঞ্জ Abell 3627এর দিকে ৬০০ কিমি/সেকেন্ডে ছুটে যাচ্ছে। মহাবিশ্বের প্রসারণ হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে জ্যোতির্বিদরা আবিষ্কার করলেন মহাবিশ্বের প্রসারণ ত্বরাণ্বিত হচ্ছে।[১১] বিগ ব্যাং(Big Bang) বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বতত্ত্বের জগতে প্রচুর গবেষণা হয়েছে আর এর ফলেই গড়ে উঠেছে বৃহৎ বিস্ফোরণ তত্ত্ব যা এখনকার প্রায় সকল বিজ্ঞানীই মহাবিশ্বের সৃষ্টির কারণ হিসেবে মনে করছেন। সাধারণভাবে বলতে গেলে ভৌত বিশ্বতত্ত্ব মহাবিশ্বের অতিবৃহৎ বস্তুসমূহ নিয়ে আলোচনা করে, যেমন: ছায়াপথ, ছায়াপথ শ্রেণী ও স্তবক, ছায়াপথ মহাস্তবক ইত্যাদি। বিশ্বতত্ত্বের নীতিসমূহ কণা পদার্থবিজ্ঞানের জগতে প্রায় অচল। এ যাবৎকালের বিজ্ঞানীদের নিশ্চিত ধারণা-বিশ্বাস ছিল যে, মহাবিশ্ব ৪ প্রধান বলে পরিচালিত। হালে বিজ্ঞানীরা ৫ম যে সত্বার অস্তিত্বের প্রমাণ দাবী করেছেন তার নামকরণ করেছেন এক্স-১৭ নামে। বিজ্ঞানীদের প্রত্যাশা: সম্ভবতঃ স্ট্রিং থিওরীতে পাওয়া যেতে পারে আবিস্কৃত ৫ম বলের যথার্থ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ।

স্থান ও সময় এবং এদের অন্তর্ভুক্ত সকল বিষয় নিয়েই মহাবিশ্ব ।। পৃথিবী এবং অন্যান্য সমস্ত গ্রহ , সূর্য ও অন্যান্য তারা ও নক্ষত্র জ্যোতির্বলয় স্থান ও এদের অন্তর্বর্তীস্থ গুপ্ত পদার্থ , ল্যামডা-সিডিএম নকশা ও শূণ্যস্থান (মহাকাশ) - যেগুলো এখনও তাত্ত্বিকভাবে অভিজ্ঞাত কিন্তু সরাসরি পর্যবেক্ষিত নয়-এমন সবপদার্থ ও শক্তি মিলে যে জগৎ তাকেই বলা হচ্ছে মহাবিশ্ব । 

সূত্র: ১. ফিজিকস অব দ্য ইউনিভার্স ডট কম

২.https://www.bigganchinta.com/physics/early-age-of-universe

বিগ ব্যাংয়ের পর তাৎপর্যপূর্ণ মহাজাগতিক ঘটনাবলীঃ

ফেজ ট্রানজিশন বা মৌলিক পরিবর্তন

বিগ ব্যাংয়ের ১০-১০ সেকেন্ড পর একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটে যা মহাবিশ্বের স্থান-কাল এবং অবস্থার পরিবর্তন করে ফেলে। বিজ্ঞানীরা এই ধরণের পরিবর্তনকে বলেন ফেজ ট্রানজিশন বা মৌলিক পরিবর্তন যা কোনো বাহ্যিক পরিবর্তন নয় বরং অভ্যন্তরীণ মৌলিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের ফলে সমস্ত স্থান-কাল সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে রূপ ধারণ করে। একেইএখন বলা হচ্ছে হিগস ফিল্ড। যদিও ব্যাপারটি বিজ্ঞানীদের কাছে সম্পুর্ণ অজ্ঞাত, অদৃশ্য। এমনকি তা উপলব্ধি করার মতোও নয়। তবে বিজ্ঞানীরা এই হিগস ফিল্ডের উপস্থিতি বুঝতে না পারলেও ইলেকট্রনের মতো মৌলিক কণিকারা এর প্রভাব ঠিকই বুঝতে পারে। অর্থাৎ অতিক্ষুদ্র মৌলিক কণিকাদের কাছে এই হিগস ফিল্ড একটি বাস্তব জিনিস।আমরা যেমন একটি বায়ু-সমুদ্রের মধ্যে ডুবে আছি, ঠিক তেমনি এই হিগস ফিল্ডও সবসময় আমাদের ঘিরে রেখেছে। তবে তা বাতাসের ন্যায় সর্বত্র নয় বরং মহাবিশ্বব্যাপী সর্বত্র। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বাইরে চলে গেলে এই বাতাস আর পাওয়া যাবে না সত্য কিন্তু মহাবিশ্বের এমন কোনো স্থান নেই যেখানে এই হিগস ফিল্ডের উপস্থিতি নেই। অর্থাৎ এটি আমাদের মহাবিশ্বের সমস্ত শূন্যস্থান জুড়েও অবস্থান করছে।

ইলেকট্রনসহ কিছু মৌলিক কণিকার হিগস ফিল্ডে  কোয়ান্টাম মেকানিক্যালের মিথস্ত্রিয়া প্রসঙ্গ

ইলেকট্রনের মতো কিছু মৌলিক কণিকা এই হিগস ফিল্ডের সাথে কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল কার্যকলাপে জড়িয়ে আছে। ফলে এসব কণিকারা কিছুটা শক্তি লাভ করে। কোনো একটি কণিকা জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এই ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করতে থাকে। এমনকি যদি সেটা স্থির অবস্থায় থাকে, তবুও চলতেই থাকে এই মিথস্ক্রিয়া। ফলে কণিকা জন্মের পরপরই মিথস্ক্রিয়া থেকে কিছুটা শক্তি পায়।

হিগস মেকানিজম

আইনস্টাইনের সেই বিখ্যাত ভর-শক্তি সমীকরণ E=mc থেকে আমরা জানি—ভর আর শক্তি মূলত একই জিনিস। কণিকারা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার ফলে শক্তি পায়। হিগস ফিল্ডের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মৌলিক কণিকাদের ভর পাবার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় হিগস মেকানিজম। 

যেসব কণিকা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল কার্যকলাপে জড়ায় না

সব কণিকাই কিন্তু হিগস ফিল্ডের সঙ্গে এই কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল কার্যকলাপে জড়ায় না। যেসব কণিকা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে এই মিথস্ক্রিয়ায় অংশ নেয়, তাদের ভর থাকে। অন্যদিকে যারা কোনো মিথস্ক্রিয়ায় জড়ায় না তারা ভরহীন থেকে যায়। কিছু কিছু কণিকা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে খুব শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া করে। ফলে এদের ভরও হয় অনেক বেশি। যেমন, টপ কোয়ার্ক। এর ভর এতই বেশি, তা পুরো একটি টাংস্টেন পরমাণুর সমান। আর যেসব কণিকা হিগস ফিল্ডের সঙ্গে খুব সামান্য মিথস্ক্রিয়া করে, তাদের ভর হয় খুবই কম। যেমন ইলেকট্রন, নিউট্রিনো। ইলেকট্রনের ভর এতই কম, কোনো পরমাণুর মোট ভর গণনা করার সময় এর ভর হিসেবে না ধরলেও চলে, নিউট্রিনোর বেলায়ও কথাটি অনেকাংশে প্রযোজ্য। আবার ফোটন হিগস ফিল্ডের সঙ্গে কোন মিথস্কফলে ফোটন ভরহীন থেকে যায়।

হিগস ফিল্ডের কোয়ান্টাকে বলা হয় হিগস বোসন

কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুসারে, কোনো কোয়ান্টাম ফিল্ডকে প্রচণ্ড শক্তিতে আঘাত করা হলে সেই ফিল্ডে এক ধরনের কম্পন তৈরি হবে। এই কম্পনে সেই ফিল্ডের কোয়ান্টা তৈরি হয়। এই কোয়ান্টাগুলোকেই আমরা কণিকা হিসেবে পর্যবেক্ষণ করি। অর্থাৎ আমরা যেসব মৌলিক কণিকার কথা বলি, এগুলো মূলত বিভিন্ন কোয়ান্টাম ফিল্ডের কম্পন। ইলেকট্রনের ফিল্ডকে আঘাত করা হলে ইলেকট্রন তৈরি হবে। কোয়ার্ক ফিল্ডে আঘাত করলে কোয়ার্ক তৈরি হবে। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডে আঘাত করলে আলোর কণিকা ফোটন তৈরি হবে। হিগস ফিল্ড যেহেতু একটি কোয়ান্টায়ান্টাম ফিল্ড, তাই হিগস ফিল্ডকে আঘাত করলেও একটি কণিকা তৈরি হবে। হিগস ফিল্ডের কোয়ান্টামকে বলি হিগস বোসন।

উল্লেখ্য, হিগস বোসন মৌলিক কণিকাদের ভর প্রদান করে না, বরং এই কাজটি করে হিগস ফিল্ড। হিগস বোসনের নিজেরও ভর রয়েছে। সেটাও আসে এই হিগস ফিল্ড থেকে।  

হিগস ফিল্ড মৌলিক কণিকাদের কেবল ভরের জোগান দেয়।লক্ষ্যনীয় যে, হিগস ফিল্ড মৌলিক কণিকাদের কেবল ভরের জোগান দেয়।  পদার্থের সকল ভর হিগস ফিল্ড থেকে আসে না।

সাধারণ পদার্থ গঠিত হয় ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রনে

ইলেকট্রনের ভর আসে হিগস ফিল্ড থেকে

ইলেকট্রন একটি মৌলিক কণিকা, তাই একটি ইলেকট্রনের সকল ভরই হিগস ফিল্ড থেকে আসে।

প্রোটনের ভর আসে দ্বৈতসূত্রে

়প্রোটন মৌলিক কণিকা নয়। দুইটি আপ কোয়ার্ক আর একটি ডাউন কোয়ার্ক মিলে একটি প্রোটন তৈরি করে। আপ কোয়ার্কের ভর ২.৩ MeV (মেগা ইলেকট্রন ভোল্ট) আর ডাউন কোয়ার্কের ভর ৪.৮ MeV। সে হিসেবে আপ-ডাউনের একক ভর হচ্ছে (২.৩+২.৩+৪.৮) = ৯.৪ MeV –এই ভর আসে হিগস ফিল্ড থেকে। । কিন্তু একটি প্রোটনের প্রকৃত ভর ৯৩৮.২৮ MeV। তাহলে প্রোটনের বাকি ভর যে সূত্রে আসে তা হচ্ছে সবল নিউক্লীয় বলক্ষেত্রের কণিকা গ্লুয়ন । বিদ্যুৎচুম্বক বলক্ষেত্র যেমন, পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন ও প্রোটনকে ধরে রাখে, তেমনি সবল নিউক্লীয় বল দুইটি আপ কোয়ার্ক ও একটি ডাউন কোয়ার্ককে একত্রে বেঁধে রেখে প্রোটন তৈরি করে। এই বেঁধে রাখার কাজটি করে সবল নিউক্লীয় বলের কণিকা গ্লুয়ন। প্রোটনের বাকি ভরটুকু আসে এই ভরহীন গ্লুয়নের গতিশক্তি থেকে। দেখা যাচ্ছে, একটি প্রোটনেশতাংশেরও কম ভর আসে হিগস ফিল্ড থেকে।

অবশেষে হিগস বোসন কণার সন্ধান লাভ

কণাপদার্থবিজ্ঞানীরা ২০১২ সালের ৪ জুলাই, বুধবার লার্জ হ্যাড্রন কোলায়ডারে (এলএইচসিতে) ১২৫.৩ GeV ভর ও ০ স্পিনের একটি কণিকা আবিষ্কার করেন। পদার্থবিজ্ঞানীরা মনে করছেন—স্ট্যান্ডার্ড মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে যে হিগস বোসন কণিকার অস্তিত্ব থাকার কথা, এটিই সেই হিগস বোসন কণা। হিগস ফিল্ডের এক ধরনের (কোয়ান্টাম) উত্তেজনার কারণে হিগস বোসন তৈরি হয়। ফলে হিগস বোসন আবিস্কারের মধ্য দিয়ে হিগস ফিল্ডের অস্তিত্ব নিয়ে আমরা অনেকটা নিশ্চিত হতে পেরেছি।

বিজ্ঞানীরা যা এখনও নিশ্চিত নন

হিগস বোসন কণা আবিস্কারের মধ্য দিয়ে হিগস ফিল্ডের অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেকটা নিশ্চিত হতে পারলেও  এখনো কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর বাকি। কোনো কণিকা কেন হিগস ফিল্ডের সাথে শক্তিশালী মিথস্ক্রিয়া করবে, আবার কিছু কণিকা কেন খুব সামান্য মিথস্ক্রিয়া করবে, সে সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা তেমন কিছুই জানি না। এমনকি ডার্ক ম্যাটার ও নিউট্রিনোর ভর হিগস ফিল্ড থেকে আসে কিনা, তা নিয়েও বিজ্ঞানীরা শতভাগ নিশ্চিতএছাড়া কিছু জটিল সমস্যাও রয়েছে। ইলেকট্রন, কোয়ার্ক, ফোটন, গ্লুয়ন ইত্যাদি যেসব কণিকার সঙ্গে আমরা পরিচিত—এ ধরনের প্রতিটি মৌলিক কণিকাকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল একদম নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের এই কাঠামো গড়ে উঠেছে প্রকৃতির কিছু প্রতিসাম্যতার উপর ভিত্তি করে। এসব প্রতিসাম্যতার উপর ভিত্তি করে পদার্থবিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলক্ষেত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য গাণিতিকভাবে প্রতিপাদন করতে পারেন! কিন্তু আমরা যে হিগস ফিল্ডের কথা জানলাম, তা কোন প্রতিসাম্যতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি। অর্থাৎ হিগস ফিল্ড বলে একটি ফিল্ড আসলে কেন আছে তা সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। বিষয়টি কিছুটা এমন যে—এটি আছে তাই আছে, কিন্তু কেন আছে তা আমরা জানি না। এটি পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে অনেক বড় একটি সমস্যা। স্ট্যান্ডার্ড মডেল আমাদের চেনাজানা দুনিয়াকে খুব নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করতে পারলেও অনেকগুলো, ‘কেন?’ এর উত্তর দিতে পারে না। এই কেনগুলোর মধ্যে একটি বড় সমস্যা হলো হিগস ফিল্ডের মতো একটি ফিল্ডের উপস্থিতি। ফলে হিগস ফিল্ডের মাধ্যমে মৌলিক কণিকাদের ভর প্রাপ্তির বর্তমান ব্যাখ্যা আসলে একটি অসম্পুর্ণ ও অসন্তোষজনক সমাধান৮। বেশিরভাগ পদার্থবিজ্ঞানীই মনে করেন যে—শুধু হিগস বোসনেই মহাবিশ্বতত্ত্বের গল্পের শেষ হতে পারে না।

বস্তু/পদার্থ এলো কি করে?

বৈজ্ঞানিক গবেষণামতে, মহাবিস্ফোরণ বা বিগ ব্যাং পরবর্তী সদ্য সৃষ্ট মহাবিশ্ব যখন একটু শীতল হলো, তখন সেখানে সৃষ্টি হয় অদৃশ্য এক ধরণের বল -যাকে বলা হয় হিগস ফিল্ড (Higgs Field)|হিগস ফিল্ডে তৈরী হয় অসংখ্য ক্ষুদে কণা। এই হিগস ফিল্ড দিয়ে ছুটে যাওয়া সব কণা হিগস-বোসনের সংস্পর্শে এসে ভরপ্রাপ্ত হয়। ভরপ্রাপ্ত এই কণা-কে বলা হয় বস্তু বা পদার্থ (Matter)।

হিগস বোসন কণা কী ?

A subatomic particle called the Higgs Boson Particle or “God’s particle”.

অর্থঃ অতি পারমানবিক কণাকে হিগস-বোসন কণা বলা হয়।বিগ ব্যাং বা মহাবিষ্ফোরণ পরবর্তী অবস্থায় কি কি সৃষ্টি হতে পারে তা আলবার্ট আইনেস্টাইন দিব্যি উপলদ্ধি করতেন। এ উপলদ্ধিতেই নিহিত ছিল আজকের সাড়া জাগানো “হিগস বোসন” নামক আবিস্কৃত অতিপারমানবিক কণাটি।

আধুনিক পর্যায় সারণীর জনক দিমিত্রি মেন্ডেলিভ

১৮৩৪ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার তবোলস্ক শহরে জন্মগ্রহণ করেন পর্যায় সারণীর জনক দিমিত্রি মেন্ডেলিভ । তিনি যেমন প্রাকৃতিক মৌলগুলোকে ধর্ম ও ভরের ভিত্তিতে একটি সারণীতে বিভিন্ন ঘরে জায়গা দিয়েছিলেন, তেমনি সারণীতে কিছু ফাঁকা ঘর রেখে ভভিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অনেকগুলো অনাবিষ্কৃত মৌলের। সেগুলো একে একে আবিষ্কার হয়েছিল তাঁর দেখানো পথে হেঁটেই। রসায়ন বিজ্ঞানকে একটা মৌলিক কাঠামোতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল তাঁর এই সারণী। ১৯০৭ সালে আজকের দিনে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে মৃত্যুবরণ করেন মেন্ডেলিভ। প্রয়াণ দিবসে বিজ্ঞানচিন্তার পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রইল। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন বিজ্ঞানচিন্তার সম্পাদনা দলের সদস্য ইবরাহিম মুদ্দাসসের।


রাসায়নিক বিক্রিয়ার কথা মানুষ জানে হাজার হাজার বছর ধরে। এক পদার্থ বিক্রিয়া করে দিব্যি আরেক পদার্থ হয়ে যাচ্ছে। বাইরে লোহা ফেলে রাখলে জং পড়ে যাচ্ছে। আগুনে পুড়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে ছাই-কয়লা। কোনো এক গাছের কষ লেগে ঝলসে যাচ্ছে ত্বক। এসব দেখতে দেখতেই মানুষের মনে প্রশ্ন এসেছে, পদার্থ আসলে কেমন? প্রতিটা পদার্থই কি আলাদা, নাকি এক পদার্থ থেকে তৈরি হতে পারে আরেক পদার্থ? মূলে এমন কী আছে, যার পরিবর্তনে লোহাকে বদলে দিয়ে বানায় মরিচা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আড়াই হাজার বছর আগেই এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন তখনকার বিজ্ঞানী-দার্শনিকেরা।

পরমাণুর অ্যারিস্টটলীয় তত্ত্ব

অ্যারিস্টটল একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন, একটা স্বর্ণখণ্ডকে কতবার অর্ধেক করলে তার স্বর্ণসত্তা হারিয়ে যাবে? উত্তরটাও হাজির করেছিলেন তিনি। নিশ্চয়ই এমন একটা সীমা আছে, যার থেকে ছোট করতে গেলে স্বর্ণ আর স্বর্ণ থাকবে না। এই সীমার নাম দিয়েছেন ‘ন্যাচারাল মিনিমাম’।

(জীবন্ত গাছ কাটলে হয়ে যায় কাঠ, কাঠ হয়ে যায় আসবাবপত্রে, ভূগর্ভে কয়লা, কয়লা হয়ে যায় হীরা, পেট্রল, । ধান চালে, চাল ভাতে পরিণত, গম আটায়, আটা ময়দায়, ময়দা রুটিতে, পিঠায় পরিণত, অক্সিজেন+হাইড্রোজেনের পরিণাম পানি, পানির পরিণাম বরফ, বাস্প ইত্যাদি। খনিজ আয়রন হয়ে যায় লোহা, লোহা থেকে ইস্পাত, ইস্পাত থেকে নাপ্রতিটা পদার্থের একটা ন্যাচারাল মিনিমাম থাকবে, যার চেয়ে ছোট করতে গেলে একটা পদার্থ আর ওই পদার্থের গুণাবলি নিয়ে থাকবে না।

আগুন, পানি, বাতাস ও মাটি।

অ্যারিস্টটলের ধারণা হলো, সব পদার্থই আসলে একই জিনিস। এর সঙ্গে ‘ফর্ম’ বা অবস্থা জড়িত। ওই অবস্থার জন্য পদার্থ নানা রূপ নেয়। কখনো পানি, কখনো রুপা, আবার কখনো পাথর বা মাটি। মূল অবস্থাও খুব বেশি নয়, মাত্র চারটা। আগুন, পানি, বাতাস ও মাটি।

পরমাণুর ডেমোক্রিটাসীয় তত্ত্ব

অ্যারিস্টটলের আগে দার্শনিক ডেমোক্রিটাস পদার্থের ক্ষুদ্রতম রূপ যে অ্যাটম বা পরমাণু, এমন একটা ধারণা দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ১. সব পদার্থই আলাদা এবং ২.  প্রতিটি পদার্থের জন্য একটা ক্ষুদ্রতম একক আছে, যা আর ভাঙা যায় না, ছোট করা যায় না যার আধুনিক নাম পরমাণু।

অবশ্য সব পদার্থই আলাদা-ডেমোক্রিটাসের এ ধারণার সাথে অ্যারিস্টটল একমত ছিলেন না। কারণ ডেমোক্রিটাসের মতে প্রতিটি পদার্থের পরমাণুই আলাদা, অর্থাৎ ভাতের পরমাণু খুব ছোট ভাতের টুকরো, এই ধারণা রাসায়নিক বিক্রিয়াসহ নানা প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যাতেই ঝামেলা তৈরি করেঅ্যারিস্টটল যে ধারণার বাহক ছিলেন, সেটাও কিন্তু ঠিক তাঁরই মৌলিক চিন্তা নয়। তাঁরও শ দুয়েক বছর আগের অ্যাম্পেডোস্লেস থেকে ধার করেছিলেন এই আইডিয়া। এই ধারণাকে ব্যবহার করে পদার্থের যে মূল কথা, বা মৌলিকতা, তাকে একটা ছকে বাঁধতে চেয়েছেন অ্যারিস্টটল। যেকোনো পদার্থই আসলে ওই চার মৌলিক অবস্থার মিশ্রণ-অ্যারিস্টটলের এই ধারণা টিকে থাকে অনেক অনেক বছর। এক পদার্থ অন্য পদার্থে রূপান্তর হয় তার চার মৌলিক গুণাগুণে পরিবর্তন এলে। সে হিসাবে একটা প্রক্রিয়া আগের অবস্থায় আর ফিরে যাওয়ার কথা না। কিন্তু আলকেমিস্ট বা ধাতুর কাজ করা মানুষেরা খুব ভালোভাবেই জানতেন এমন অনেক প্রক্রিয়া আছে, যেখানে পদার্থের রূপ পরিবর্তন হলেও পরে সেই রূপে আবার ফিরে যাবে।

অষ্টম শতাব্দীর আরব বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ানপ্রত্যেক বস্তুই মূলে পৌঁছে (ফারাবী আল আরাবী)।

আধুনিক ইউরোপে আসার আগে অ্যারিস্টটলের ধারণায় অনেক বেশি পরিবর্তন না এলেও নতুন একটা অংশ যুক্ত হয়। ধারণাটি প্রবর্তন করেন অষ্টম শতাব্দীর আরব বিজ্ঞানী জাবির ইবনে হাইয়ান। তাঁর দেওয়া মূলনীতি ছিল দুটি। একটাকে ডাকা হতো ১. মার্কারি বা পারদ নামে, আরেকটা ২. সালফার। এই মার্কারি বা সালফার ঠিক আমাদের চেনা পারদ-সালফার নয়। মার্কারি প্রিন্সিপলটা হলো ‘ঠান্ডা’ ও ‘ভেজা’। অন্যদিকে সালফার হলো ‘গরম’ ও ‘শুকনো’। ইংরেজিতে cool-moist ও hot-dry। এই চারটা ধর্ম চার মৌলিক পদার্থের মাঝামাঝি নতুন একটা অবস্থানের নির্দেশ করে। এই সালফার-মার্কারি থিওরি অনুযায়ী এই চারটা ধর্মই তৈরি করে মূল সাতটা ধাতু—স্বর্ণ, রৌপ্য, তামা, টিন, লোহা, সিসা ও পারদ। সালফার-মার্কারি থিওরির চার কোয়ালিটি নির্ধারণ করে দেয় কোন ধাতু কেমন হবে। যেমন লোহার গলনাঙ্ক অনেক বেশি, ঘষা খেলে স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়, তাই এতে নিশ্চয় সালফার অংশ অর্থাৎ গরম-শুকনা অ্যারিস্টটলের চার মৌল এবং জাবির ইবনে হাইয়ানের সালফার-মার্কারি—এ মিলেই তৈরি হয় বহুল প্রচলিত তালিকা। একটা বর্গাকৃতির চার কোণে চারটি মৌলিক পদার্থের এই তালিকাকেই বলা যায় প্রথম পর্যায় সারএই ধারণায় নতুনত্ব যোগ করেন ষষ্ঠদশ শতকে সুইস চিকিৎসা বিজ্ঞানী প্যারাসেলসাস। তিনি মার্কারি-সালফার থিওরিতে ‘সল্ট’ বা লবণ যোগ করে আরেকটু বিস্তৃত তত্ত্ব বানান। সালফার-মার্কারি-সল্টের এই তত্ত্ব অনুসারে জাবিরের মতো শুধু ধাতুই নয়, অন্য সব পদার্থও তৈরি হয় এসব ধর্ম দিয়েই। তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল ওষুধের ব্যাপা 

সপ্তদশ শতকে পিয়েরে গ্যাসেন্দি আবার ডেমোক্রিটাসের অবিভাজ্য পরমাণুর ধারণা ফিরিয়ে আনেন। দে কার্তে প্রস্তাব করেন মেকানিক্যাল বা যান্ত্রিক বিশ্বের। মাঝখান দিয়ে রবার্ট বয়েল প্রমাণের চেষ্টা করেন, সল্ট বলে আসলে কিছু নেই। তিনিই প্রথম আলকেমি আর রসায়নের মধ্যে একটা রেখা টেনে দেন। এমনকি তাঁর ধারণাতেই তখন উঠে আসে পরমাণু-অণু-রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো কিছু ধারণার 

কিন্তু এর মধ্যেই জোসেফ প্রিস্টলি বাতাসের গ্যাসগুলোকে আলাদা করতে সক্ষম হন। ল্যাভয়সিয়ে ১৭৭৭ সালে ৩৩টা মৌলিক পদার্থের তালিকা প্রকাশ করেন। প্রথমবার আলাদা করেন ধাতু ও অধাতুর মধ্যে১৮০৩ সালে জন ডাল্টন প্রস্তাব করেন ‘ডাল্টন’স ল’। এরপরই আস্তে আস্তে মৌলিক পদার্থের সত্যিকার ধারণা মানুষ বুঝতে শুরু করে। মৌলিক পদার্থগুলোকে আলাদা করতে শুরু করে। এরপর যত দিন গিয়েছে, মৌলিক পদার্থের সংখ্যা বেড়েছে। তত দিনে যেহেতু মানুষ বুঝে গিয়েছে, মৌলিক পদার্থই সব পদার্থ তৈরির মূল। তাই বিজ্ঞানীরা চিন্তা করেছেন, মৌলিক পদার্থগুলোকে একসঙ্গে করে একটা তালিকা করে কোনো একটা ছাঁচে ফেলতে। নানাজনের চেষ্টা শেষে মেন্ডেলিভ, ১৮৬৯ সালে ৬৩ মৌলের তালিকা সাজিয়েছিলেন পারমাণবিক ভরের ওপর ভিত্তি করে। কারণ, তত দিনে মানুষ জেনে গেছে, প্রতিটা মৌলের একটা নির্দিষ্ট পারমাণবিক ভর আপারমাণবিক ভর ধরে সাজাতে গিয়ে মেন্ডেলিভ সুন্দর একটা প্যাটার্ন বের করে ফেলেন। কতগুলো সারি-কলামে ভাগ করে ফেলা যায় মৌলগুলোকে, তাতে তার ধর্মও মিলে যায় বেশ। সারিগুলোকে নাম দেন পিরিয়ড, আর কলামগুলোকে গ্রুপ। পিরিয়ড আর গ্রুপ মিলে হয়ে আমাদের পর্যায় সারণি। মেন্ডেলিভ বাজিমাত করেন আসলে অজানা মৌলের ভবিষ্যদ্বাণী করে। তাঁর সারণিতে ফাঁকা রাখা জায়গায় যখন মৌলে খুঁজে পাওয়া যায়, তখন বিশ্বাস জন্মে, কিছু একটা নিশ্চয় আছে এই পর্যায় সারণির পেছনে। তখন মানুষ ভেবেছিল পারমাণবিক  

এত দিন পরমাণুকে ধরা হয়েছিল অবিভাজ্য। গোলটা বাধে ১৮৯৭ সালে। সে বছর জে জে থমসন ইলেকট্রন আবিষ্কার করেন। অবিভাজ্য পরমাণুতে ইলেকট্রনের উপস্থিতি ঠিক স্বস্তিকর নয়। প্রথম দফায় ইলেকট্রনকে পদার্থের মধ্যে সুষমভাবে ছড়িয়ে দিয়ে পরমাণুর অবিভাজ্যতার ধারণা কিছুটা বাঁচানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে রাদারফোর্ডের স্বর্ণপাত আর আলফা কণার পরীক্ষা নিশ্চিত করে দেয়, পরমাণু কোনো অবিভাজ্য জিনিস না। পরমাণুরও একটা গঠন আছে। তারপর শুরু হয় নতুন ও অত্যাধুনিক রসায়নের এক যুগ। এর হাত ধরেই পদার্থবিজ্ঞানে আসে নতুন তত্ত্ব। কোয়ান্টাম তত্ত্ব, যা পদার্থবিজ্ঞানের আরও কিছু সমস্যার সমাধানে বেশ কার্যকর ভূমিকা দেখায়। বিজ্ঞনী নিলস বোর, সামারফেল্ডরা আরেকটু এগিয়ে নেন পরমাণুর গঠন। আর পরমাণুর গঠন বুঝতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখেন, ইলেকট্রন পরমাণুর নিউক্লিয়াসের চারপাশে কীভাবে স্তরে স্তরে অবস্থান করে। ওই স্তরগুলো মেলাতে গিয়ে দেখা যায়, পর্যায় সারণিতে এক গ্রুপের মৌলগুলো যে প্রায় একই ধর্ম দেখায়। তার মূলে আছে ওই পরমাণুর চারপাশে থাকা►মৌলের গঠন এবং আইসোটোপ সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় প্রথমে পর্যায় সারণি সাজানো হয়েছিল পারমাণবিক ভর অনুসারে। ফলে, বেশি পারমাণবিক ভরের একাধিক মৌলকে অবস্থান দিতে হয়েছিল কম ভরের মৌলের আগে। সে সমস্যাও মিটে যায় যখন পারমাণবিক সংখ্যা আবিষ্কার হয়। পারমাণবিক সংখ্যা হলো কোনো একটা পরমাণুতে থাকা প্রোটনের সংখ্যা। আর এই প্রোটনসংখ্যাই একটা পরমাণু কী পদার্থ হবে, তার ভিএকটা পরমাণুতে থাকে ইলেকট্রন, প্রোটন আর নিউট্রন। প্রোটন আর নিউট্রন থাকে পরমাণুর মাঝে, যাকে বলে নিউক্লিয়াস। ইলেকট্রনগুলো থাকে বাইরে, চারপাশে কতগুলো কোয়ান্টাম অরবিটালে। একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসে কতগুলো প্রোটন আছে তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় কোন্ নামের কোন্ ধামের পরমাণু, কোন্ জাতের বস্তু/পদার্থ। যেমন কোন একটা পরমাণুর নিউক্লিয়াসে ১১টা প্রোটন থাকলে সে বস্তুর নাম হবে সোডিয়াম, ১২টা প্রোটন থাকলে ম্যাগনেসিয়াম। তেমনিভাবে ১১৮টা প্রোটন থাকলে অগানেসএরপর আসে ইলেকট্রন। একটা সাধারণ পরমাণুতে যতগুলো প্রোটন থাকে, ইলেকট্রনও থাকে ঠিক ততটা। ইলেকট্রন যেহেতু নিউক্লিয়াসের বাইরে থাকে, মাঝেমধ্যে একটা–দুইটা ছুটে যেতে পারে বা একটা–দুইটা বাড়তিও হতে পারে। এই অবস্থাই হলো আয়নিত অবস্থা বা চার্জিত অবস্থা। ইলেকট্রন নিয়ে বা দিয়ে একটা পরমাণু খুব সহজেই ফিরে যেতে পারে তার আগের অবস্ 

দেখা যাচ্ছে, পারমাণবিক সংখ্যা বা প্রোটনসংখ্যাই একটা পরমাণুর সবচেয়ে মৌলিক ব্যাপার, ধ্রুব ব্যাপার। সে হিসাবে পরমাণুর তালিকা এক-দুই-তিন করে পারমাণবিক সংখ্যা হিসেবে সাজিয়ে নিলেই হয়। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। তালিকা ধরে মুখস্থ করা ছাড়া অন্য কোনো কাজেই আসবে না। এখানেই বাহাদুরি মেন্ডেলিভের পর্যায় সারণির। তার পর্যায় সারণি ভর অনুসারে সাজালেও সারি কলামে ভাগ করা হয়েছিল মৌলগুলোর ধর্ম ধরে। মৌলগুলোর ধর্মের সামঞ্জস্য রাখতে নিজের বানানো ভর অনুযায়ী সাজানোর সূত্র একাধিক জায়গায় ভেঙেছযত দিন গিয়েছে, কোয়ান্টাম মেকানিকসের উন্নতি ঘটেছে, বিজ্ঞানীরা ইলেকট্রন বিন্যাস তত ভালো বুঝেছেন। পর্যায় সারণির তালিকার রহস্য ততই উন্মোচিত হয়েউল্লেখ্য,  ১৮৭১ সালে মেন্ডেলিভ  পরিমার্জিত যে পর্যায় সারণিটি দিয়েছিলেন, সেখানে সবচেয়ে ভারী মৌল ছিল ইউরেনিয়াম যার প্রোটনসংখ্যা ৯২। অথচ মাঝের অনেকগুলো প্রোটনসংখ্যার মৌল নেই। তাহলে সেগুলো কোথায়? ওগুলোই পরবর্তী সময়ে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়।

পাওয়া যায়নি টেকনিশিয়াম

খুঁজতে গিয়ে পরবর্তীত প্রকৃতিতে অনেকগুলোই পাওয়া গেছে। কিন্তু পাওয়া যায়নি টেকনিশিয়াম। ৪৩ পারমাণবিক সংখ্যার এই মৌলের অর্ধায়ু খুব কম। তাই শত কোটি বছরের পৃথিবীতে পৃথিবী গঠনের সময় উৎপন্ন হয়ে থাকলেও এত দিনে সবটাই ভেঙে অন্য কোনো পদার্থ হয়ে গেছে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ করে। শেষমেশ ১৯৩৭ সালে ল্যাবে বানানো হয়েছে।

কৃত্রিম মৌল প্রসঙ্গ

ল্যাবে টেকনিশিয়াম বানানোর পর বিজ্ঞানীরা অন্য না পাওয়া মৌলগুলো খুঁজেছেন গবেষণাগারে। ইউরেনিয়াম পর্যন্ত বাকি সবগুলোও তাঁরা বানিয়েছেন ল্যাবে 

প্রকৃতির কোথাও নেই-এমন মৌল ল্যাবরেটরিতে

প্রকৃতিতে কোথাও পাওয়া যায় না- এমন ২৪টি মৌল ল্যাবরেটরিতে বানিয়েছেন বিজ্ঞানীরপর্যায় সারণিতে দেখা যায়, অগানেসন হচ্ছে সর্বশেষ মৌল- যার পারমাণবিক সংখ্যা ১১৮। এই ১১৮টা মৌলই মানুষ কোনো না কোনো সময় পর্যবেক্ষণ করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ল্যাবরেটরিতে ১১৯ বা পরের মৌলগুলো বানানো যাবপর্যায় সারণিতে পর্যায় বা সারি আছে ৭টা। ১১৮ নম্বর মৌল আবিষ্কারের পর ৭টা পর্যায়ই পূর্ণ হয়ে গেছে। এর পরের মৌল, মানে ১১৯ বা পরের কোনো মৌল আবিষ্কার হলে তার অবস্থান হবে অষ্টম পর্যায়ে। মজার ব্যাপার হলো, শুরু থেকেই বর্তমান রূপের পর্যায় সারণির পর্যায় ছিল ৭টা। তাই অষ্টম পর্যায় একটা বড় ঘটনাই হবে পর্যায় সারণির জন্য। যদি ইলেকট্রন বিন্যাস দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে, ১১৯ নম্বর মৌল পাওয়া সহজ হওয়ার কথা নয়। নতুন পর্যায় শুরু করাও কঠিন হবে। তাই যাঁরা কৃত্রিম মৌল নিয়ে কাজ করতেন, তাঁরা এখন তাঁদের টার্গেট পরিবর্তন করছেন কিছুটা। নতুন মৌল না খুঁজে তাঁরা চেষ্টা করছেন ইতিমধ্যে বানানো মৌলগুলোর ধর্ম সম্পর্কে কিছু জানা যায় কি না। তাই অনেকগুলো কৃত্রিম মৌল আবিষ্কার করা বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই নতুন মৌল খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছে। ১১৮তম মৌল যার নামে, ইউরি অগানেসিয়ান, তিনি এখনো নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাশিয়ার জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ। তিনি জানিয়েছেন, নতুন একটা মৌল খুঁজে পাওয়া কঠিন বলে তাঁরা এখন আরও ভারী একটা পরমাণু বানানোর চেয়ে এর মধ্যে আবিষ্কৃত পরমাণুগুলোর ধর্ম নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আরও ভারী একটা মৌল খুঁজে পাওয়াকে আমি অসম্ভব বলছি না, কিন্তু বর্তমানপর্যায় সারণিতে একটা মৌল কোনো একটা গ্রুপে আছে, মানে সে ওই গ্রুপের অন্য মৌলগুলোর সঙ্গে ধর্মে একটা সামঞ্জস্য রাখে।(এতে প্রতীয়মান হয় যে, মৌল অনেকটা সামাজিক, সমাজবদ্ধ কণা, যে নিকট প্রতিবেশির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সহাবস্থান করে থাকে)।

কিছু বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন

অতি ভারী পরমাণুগুলো, মোটামুটি ১০০-এর বেশি পারমাণবিক সংখ্যার মৌলগুলো আসলেই গ্রুপিং করে কিনা? অর্থাৎ গ্রু এই ধর্মের সাদৃশ্যতা দেখাবে কি না, নিশ্চিত করে এখনো বিজ্ঞানীরা জানেন না। যেমন ১১৮তম মৌলটি (অগানেসন) আছে নিষ্ক্রিয় গ্যাসের সঙ্গে একই গ্রুপে। নিষ্ক্রিয় গ্যাসগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এরা সহজে অন্য মৌলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে না। সাধারণ অবস্থায় এরা গ্যাস। এখন অগানেসনও কি গ্যাসই হবে? এই মৌলও কি অন্য মৌলের সঙ্গে সহজে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় যাবে না? গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রের হিসাব অনুযায়ী, অগানেসন অন্য নিষ্ক্রিয় গ্যাসের মতো হওয়ার কথা নয়।

প্রশ্ন উঠেছে, কোনো একটা মৌলের পর থেকে পর্যায় সারণির যে ধর্মের সাদৃশ্যতার বৈশিষ্ট্য, তা কি শেষ হয়েই যাবে?

কতিপয় বৈজ্ঞানিক উত্তর

রসায়নবিদদের একদলের মত হলো, একটা সময় গিয়ে ধর্মের সাদৃশ্যতা শেষ হয়েই যাবে। কারণ ইলেকট্রন সংখ্যা যখন অনেক বেড়ে যাচ্ছে, অরবিটালে ইলেকট্রনের শক্তির পার্থক্য অনেক কমে যাবে। তাই অনেক ভারী মৌলের রাসায়নিক ধর্মে সাদৃশ্যতা আগের মতো বজায় থাকবে না।

আপেক্ষিকতা–সংক্রান্ত সমস্যারও উদ্ভব হতে পারে। খুব ভারী মৌলে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব কাজ করবে ইলেকট্রনের গতি অনেক বেশি হওয়ায়। তাই দেখা যাবে ধর্মে আরও বেশি পার্থক্য হচ্ছেআরেকটা সমস্যা হলো, একটা মৌলের স্থায়িত্ব। এখন একটা মৌলকে স্বীকৃতি পেতে বানানোর পরে মাত্র ১০-১৪ সেকেন্ড থাকলেই হয়। কিন্তু এত অল্প সময়ে ওই মৌলের ধর্ম সম্পর্কে খুব সামান্যই ধারণা পাওয়া যায়। ১০০-এর বেশি পারমাণবিক সংখ্যার মৌলগুলোর বেশির ভাগই চোখের পলকে বিকিরণ করে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের একটা আশা, হয়তো এমন কোনো আইসোটোপ বানানো যাবে, এমন কোনো পদ্ধতি পাওয়া যাবে, যাতে ল্যাবে বানানো মৌলের স্থায়িত্ব একটু বাড়ানো যায়। এ জন্য চলছে আরেকাংসাধারণভাবে প্রোটন নিউট্রনের অনুপাতের একটা ভূমিকা আছে পরমাণুর স্থায়িত্বে। ফ্লেরোভিয়াম-২৯৮, যার প্রোটন ১১৪ ও নিউট্রন ১৮৪টা, ধারণা করা হয়, এই আইসোটোপ কিছুটা স্থায়ী হবে। আসলেই স্থায়ী হবে কি না, হলে অন্য পরমাণুগুলোর জন্যও এমন স্থায়ী আইসোটোপ বানানো যায় কি না, তা নিয়েই এই দলের বিজ্ঞানীদের সব মিলিয়ে রসায়নবিদেরা সবাই একমত যে পর্যায় সারণিতে একসময় ‘শেষ’ আসবে। তারপর নতুন কোনো মৌল পাওয়া যাবে না। এর পেছনে যুক্তি হলো, অনেক বেশি ইলেকট্রন যখন একটা নিউক্লিয়াসের চারপাশে থাকবে, একটা সময় দেখা যাবে, ইলেকট্রনগুলো আর ওই নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে বাধা থাকছে না। তখন আসলে ওই মৌলের আর অস্তিত্বই থআরেকটি প্রশ্নঃ অআজকের যে অনলাইন প্রযুক্তি তারও কি সমাপ্তি অআছে যেদিন যেন ক্ষণ থেকে নিস্ত্রিয় হয়ে যাবে এই প্রযুক্তি? তারও বৈজ্ঞানিক হ্যাঁ বোধক জবাব রয়েছে-তবে সহসা নয়, কোটি কোটি বছর পার হলেই নাকি এমন অবস্থা বিশ্বকে সম্মুখীন হতে হবে। তার অআগেই হয়তো কেয়ামত সংঘটিত হয়ে যেতে পারে।

By the grace of almighty Allah, I am being researched in light of apply our force according to our knowledge in our regular works. on the subject matter: "We Move with Knowledge"

যে প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব আবিস্কার করে থাকে

সাধারণত: মানুষের মন মস্তিস্ক দু প্রকারে কাজ করে থাকে। ১.মনে করা এবং ২. মনে পড়া। ১. স্বেচ্ছাপ্রণোদিত (ইচ্ছাকৃত) চিন্তার মাধ্যমে কোন বিষয় স্মরণ বা মনে করা হয়ে থাকে। স্বত:স্ফুর্ত (অনিচ্ছাকৃত) চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে কোনো বিষয় স্মরণে অআসা বা মনে পড়া। অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, বিজ্ঞানীরা উভয় প্রক্রিয়ায় গবেষণা এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অআবিস্কার করে থাকেন। নিম্নে এতদ্ববিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া গেলঃ

বিশ্বতত্ত্ব বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণার স্বরূপপরমাণুর অ্যারিস্টটলীয় তত্ত্ব

অ্যারিস্টটল একটা প্রশ্ন তুলেছিলেন, একটা স্বর্ণখণ্ডকে কতবার অর্ধেক করলে তার স্বর্ণসত্তা হারিয়ে যাবে? উত্তরটাও হাজির করেছিলেন তিনি। নিশ্চয়ই এমন একটা সীমা আছে, যার থেকে ছোট করতে গেলে স্বর্ণ আর স্বর্ণ থাকবে না। এই সীমার নাম দিয়েছেন ‘ন্যাচারাল মিনিমামঅ্যারিস্টটল যে ধারণার বাহক ছিলেন, সেটাও কিন্তু ঠিক তাঁরই মৌলিক চিন্তা নয়। তাঁরও শ দুয়েক বছর আগের অ্যাম্পেডোস্লেস থেকে ধার করেছিলেন এই আইডিয়া।(বিচ“এই যে ভরশক্তির সমীকরণ অআইনস্টাইন দাঁড় করালেন, এটার কথা কিন্তু আইনস্টাইনই প্রথম বলেননি। অর্থাৎ E=mc² নামের যে বিখ্যাত সমীকরণের জনক বলে অআমরা জানি, এই সমীকরণের প্রবক্তা আইনস্টাইন নিজে নন। হেনরি পয়েনকেয়ার, যাঁকে মনে করা হতো বিশেষ অআপেক্ষিকতা তত্ত্বের জন্য আইনস্টাইনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী; তিনিই এই সমীকরণের প্রথম প্রবক্তা” (বিঃচিঃ মার্চ, ২০২০, বর্ষঃ ৪, সংখ্যাঃ ০৬, পৃষ্ঠা ২২)। (এতে প্রতীয়মান হয়, কোন বৈজ্ঞানিক থিসিস একই সঙে একাধিক বিজ্ঞানীর অন্তর্দৃষ্টিতে লালিত হতে পারে)। এই অন্তর্দৃষ্টির উৎস কী? এর ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কী? এলহাম-এলকা-কাশফ?

নিউট্রিনো কি?

(بالإنجليزية: (Neutrino): “নিউট্রিনো”(Neutrino)হচ্ছে বৈদ্যুতিক চার্জবিহীন দূর্বল ও সক্রিয় এক প্রকার অতি ক্ষুদ্র পারমানবিক কণা। ধারণা করা হয়, এই ক্ষুদ্র কণা ‘অশুন্য’ (Non-Zero) ভরের কণা। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সার্ণের গবেষকরা এই নিউট্রিনো আবিস্কারের ঘোষণা করেন। বিজ্ঞানীদের দাবীঃ আবিস্কৃত নিউট্রিনো বর্তমান প্রচলিত সাধারণ আলোক কণা থেকে দ্রুত বেগ সম্পন্ন।বিজ্ঞানী পাউলি প্রথমবারের মত উপলদ্ধি করেন যে, ভরবেগ, শক্তি, কৌণিক ভরবেগ ইত্যাদি নিত্যতা বজায় রাখার জন্য ইলেকট্রনের সাথে আরেকটি খুবই হালকা, আধানহীন এবং প্রায় অদৃশ্য কণার উপস্থিতি প্রয়োজন। উল্লেখযোগ্য, ১৯৩০ সালে পাউলি (Pauli) যখন প্রথমবার এই কণাটির অস্তিত্ব আছে বলে প্রস্তাব করেন, তাঁর কিছু পরেই নাকি তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “আমি একটি ভয়ানক কাজ করে ফেলেছি | আমি এমন একটি কণার অস্তিত্বের প্রস্তাব রেখেছি যা সনাক্ত করা অসম্ভব”।

নিউট্রিনো শেষমেষ ১৯৫৬ সালে প্রথমবার সনাক্ত হয়এবং নামকরণ করা হয় “নিউট্রিনো”। নিউট্রিনোর ধারণা প্রথম বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন পরমাণুর বেটা ক্ষয়ের বিশ্নেষণ করতে গিয়ে। তাতে দেখা গেছে নিউট্রিনো ও ইলেকট্রন প্রকৃতিতে যেন দুই ভাইয়ের উল্লেখ্য, মহাবিশ্বের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুসারে মৌলিক কণাগুলো প্রধানতঃ তিন প্রকার যথাঃ কোয়ার্ক, বোসন ও লেপটন। এর মধ্যে লেপটন দুই প্রকার যথাঃ ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো। তিন ধরণের ইলেকট্রনের মধ্যে রয়েছে (১) ইলেকট্রন ইলেকট্রন (অথবা শুধুই ইলেকট্রন) (২) মিউ ইলেকট্রন (মিউয়ন) এবং (৩) টাউ ইলেকট্রন (টাউয়ন) এবং এর প্রতিটি ইলেকট্রনের সাথে আছে একটি করে নিউট্রিনো যথাঃ (১) ইলেকট্রন নিউট্রিনো, (২) মিউ নিউট্রিনো।

 মহাজাগতিক মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের মূল উপাদান কৃষ্ণ বা অন্ধকার শক্তি 

বর্তমানের মহাজাগতিক মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্বের মূল উপাদান মূলতঃ কৃষ্ণ বা অন্ধকার শক্তি। ধরা হচ্ছে যে এই শক্তি সারা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে আছে এবং মহাবিশ্বের প্রসারণের পিছনে মূল ভূমিকা পালন করছে। কৃষ্ণ শক্তির পরিমাণ যেখানে ৭৪% ভাগ ধরা হয়, মোট বস্তুর পরিমাণ সেখানে ২৬%।

কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্টঃ

কোয়ান্টাম এনটেঙ্গেলমেন্ট বা কোয়ান্টাম বিজডকথাটার মানে হলো, দুটি বিজড়িত কণা অনেক দূরে অবস্থান করেও পরস্পর নির্ভরশীল বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে পারে। একে অপর থেকে যত দূরেই থাকুক, একের অবস্থান, ভরবেগ, ঘূর্ণন ইত্যাদি পুরোপুরি অন্যের ওপর নির্ভর করে। হোক তারা শত শত কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। মনে করুন, কোনো স্ফটিক থেকে একটি লেজার রশ্মি নিক্ষিপ্ত হলো, যা একটিমাত্র ফোটন কণাকে ভেঙে দুটো বিজড়িত কণায় পরিণত করতে পারে। এখন দুটো ফোটন যদি দুদিকে রওয়ানা হয়ে যায়, পৌঁছে যায় লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ দূরেও, তবু একটির যেকোনো বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করা মাত্রই অপরটির বৈশিষ্ট্য জানা যাবে। যেমন একটি যদি স্পিন-আপ কণা হয়, তবে নিশ্চিত করে বলা যাবে, অপরটি হলো স্পিন-ডাউন কণা।

 যদি জানা যায়, একটি ঘুরছে ঘড়ির কাঁটার দিকে, তবে সাথে সাথে বলে দেওয়া যাবে, অপরটি ঘুরবে ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে। তাদের দূরত্ব এক সেন্টিমিটার হোক কিংবা তারা মহাবিশে^র দুই আলাদা প্রান্তেই থাকুক সেটা বিবেচ্য নয়। এখানেই আইনস্টাইনের ঘোর আপত্তি। তাঁর মতে, একটি কণার কিছু ঘটলে তার প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে অন্যটির ওপর পড়তে পারে না।

উদাহরণস্বরূপ, লাল-কালে ২টি দুই রঙের কলম। আবুল কালাম না দেখে একটি নিয়ে কানাডা চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে দেখেন আনীত কলমটি লাল রঙ্গের। সাথে সাথে তিনি জানতে পারবেন, বাংলাদেশে ফেলে আসা কলমটির রঙ কোন রঙের।কারণ, (আপাত দৃষ্টিতে) লঙ্ঘিত হচ্ছে আপেক্ষিকতা তত্ত্বের অন্যতম একটি নীতি। কোনো তথ্যই আলোর চেয়ে বেশি বেগে যেতে পারে না। কিন্তু ১৯৬৪ সালে পদার্থবিদ জন বেল তাঁর ’বেল অসমতা’র মাধ্যমে প্রমাণ করেন, কণারা এমন পরস্পর-সম্পর্কযুক্ত আচরণ করতে পারে। যদিও তারা থাকে বহু বহু দূর। যে দূরত্বে আলোর চেয়ে দ্রুত কোনো তথ্য পৌঁছতে পারার কোনো কথা নয়। উপরন্ত প্রমাণ করেন, এমন ঘটনা ঘটতে কোনো সময়ই লাগে না। ফলে দূরত্ব কোনো প্রভাবই রাখতে পারে না এক্ষেত্রে। আসলে, কোয়ান্টাম বিজড়ন আপেক্ষিকতা নীতির বিরুদ্ধে যায় না। কারণ, আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারে, কোনো স্থান থেকে অন্য স্থানে আলোর চেয়ে দ্রুত তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব নয়। আর কোয়ান্টাম বিজড়ন প্রক্রিয়ায় তথ্য প্রেরণ করা হয় না। এ কৌশল কাজে লাগিয়ে ঠিক আলোর চেয়ে দ্রুত তথ্য প্রেরণের কাজ সম্ভব নয়। পরবর্তীতে অসংখ্য পরীক্ষায় বেল অসমতার পক্ষে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন

অনিশ্চয়তা নীতি অনুসারে আমরা যাকে শূন্যস্থান বলি, অর্থাৎ, যেখানো কোনো পদার্থের অস্তিত্ব নেই, সেটাও আসলে ঠিক শূন্য নয়। এই নীতি অনুসারে ক্ষেত্রের শক্তির মান ও তার পরিবর্তন একই সাথে সঠিক করে জানা যাবে না। তার মানে, শূন্যস্থানের কোনো ক্ষেত্রের মান ও পরিবর্তনের হার একই সাথে শূন্য হওয়া সম্ভব নয়। ফলে, আমরা যাকে শূন্যস্থান বলি সেখানেও অবিরত তৈরি হচ্ছে জোড় কণা। এগুলোকে বলা হয় ভার্চুয়াল কণা। আর এ প্রক্রিয়ার নামই কোয়ান্টাম ফ্লাকচুয়েশন। এক সাথে তৈরি হয় এক জোড়া বিপরতি চার্জের কণা। সৃষ্টির পরমূহুর্তের আবার এরা একে অপরকে বিলীন করে দেয় পল ডিরাকের আবিষ্কৃত কণা-প্রতিকণা দিয়ে।

সংরক্ষণশীলতা নীতির লঙ্ঘন

চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান অনুসারে শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস সম্ভব নয়। সম্ভব শুধু রূপান্তর। কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করাই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কাজ। ভার্চুয়াল কণা তৈরির সময়ই কণাগুলো তৈরির জন্যে শক্তি পায় কোথায়? এরা সমায়িক সময়ের সংরক্ষণশীলতা নীতি ভঙ্গ করে। ধার করে কিছু শক্তি। অল্প সময় পরে আবার বিলীন হওয়ার মাধ্যমে ফিরিয়ে দেয় সেই শক্তি। তবে বাইরে থেকে শক্তি সরবরাহ করা হলে ভার্চুয়াল কণা বাস্তব কণায় পরিণত হতে পারে।

কোয়ান্টাম টানেলিং

চিরায়ত (ক্ল্যাসিকাল) নিউটনীয় বল বিদ্যা তত্ত্বমতে, পথ চলতে চলতে যদি একটি পুরু দেয়াল এসে যায়, তাহলে যাত্রা ওখানেই শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু অতিপারমাণবিক কণার বেলায় যাত্রায় নেই কোনো বিরতি অর্থাৎ একটি প্রতিবন্ধকের পেছনে আটকা পড়া কোনো কণিকাকে প্রতিবন্ধকের অপর পাশে দেখা যাওয়ার একটা অশূন্য সম্ভাবনা রয়েছে যা কণা-তরঙ্গের দ্বৈত আচরণের ফল। কণার জন্যে কাজটি যত কঠিন, তরঙ্গের জন্যে ততটা নয়। তেজস্ক্রিয় ক্ষয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এই উপায়েই। ফলে নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়ে পড়ে আলফা কণা।

পরিমাপের আগে অস্তিত্বহীন?

আলবার্ট আইনস্টাইন বলতেন, ‘আমরা যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি না, তখন কি (আকাশে) চাঁদ থাকে না?’ কথাটা চাঁদের জন্যে সত্য না হলেও অতিপারমাণবিক জগতে কিন্তু সত্য। পর্যবেক্ষণের আগ পর্যন্ত কণার অস্তিত্বই থাকে না। ২০১৫ সালে এক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয় এই কথা। অস্ট্রিয়ান পদার্থবিদ অ্যান্ড্রু ট্রাসকট নতুন করে এর প্রমাণ দেন যে, ‘পরিমাপই সবকিছু । না তাকানো পর্যন্ত কোয়ান্টাম স্তরে বাস্তবতা বলতে কিছুই নেই।’ তাঁর দল পরীক্ষাটি চালান হিলিয়াম পরমাণু দিয়ে।

সূত্র: অ্যা ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম/স্টিফেন হকিং, এফন্যাল ডট জিওভি, ইউঅরিজন ডট এজু, ডিসকভার ম্যাগাজিন, নিউ অ্যাটলাস ডট কম, উইকিপিডিয়া।•          http://newton.ex.ac.uk/research/qsystems/people/jenkins/mbody/mbody2.html

•          https://en.wikipedia.org/wiki/History_of_quantum_mechanics

•          http://home.fnal.gov/~pompos/light/light_page28.html

•          http://abyss.uoregon.edu/~js/21st_century_science/lectures/lec13.html

•          http://discovermagazine.com/2005/jun/cover

•          https://newatlas.com/quantum-theory-reality-nu/37866/https://qm.bishwo.com/quick-glance.html

হাইজেনবার্গের আনসার্টেইনিটি প্রিন্সিপাল বা অনিশ্চয়তা নীতি

বলা হয়ে থাকে, মহাবিশ্বে নিহিত জ্ঞান ভান্ডার এতই প্রাচুর্যময় যে, তাতে এমন প্রশ্নও রয়েছে যার উত্তর এ জগতে পাওয়া যাওয়ার সীমিত জ্ঞানের অধিকারী মানব সাধ্যের বাইবিশেষ করে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে হাইজেনবার্গের আনসার্টেইনিটি প্রিন্সিপাল বা অনিশ্চয়তা নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা আমাদের বাহ্যিক জগত সম্পর্কে ধারনা কিছুটা বদলে দেয় এবং যা আমাদের মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়, যার কিছু উত্তর আমাদের জানা আর কিছু অজানা।

১৯২৭ সালে ২৬ বছর বয়সী জার্মান পদার্থবিদউরনার হাইজেনবার্গ আনসার্টেইনিটি প্রিন্সিপাল বা অনিশ্চয়তা নীতিটি প্রকাশ করেন। তাই এই নীতিটিকে হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি বা হাইজেনবার্গস আনসার্টেইনিটি প্রিন্সিপাল বলা হয়। তাঁর এই নীতিটি অনুসারে, আমরা একটি কনার অবস্থান যত নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করতে পারবো এর ভরবেগ ততই অনিশ্চিত হয়ে যাবে, অর্থাৎ এর ভরবেগ ঠিক কত তা বের করা তত বেশী কঠিন হয়ে পড়বে। ঠিক একইভাবে একটি কণার ভরবেগ যত নিশ্চিতভাবে আমরা নির্ণয় করতে পারবো তার অবস্থান নির্ণয় করা তত কঠিন হয়ে যাবে আমাদের পক্ষে (উল্লেখ্য, ভর এবং বেগেভরবেগ বলে)। একটি কণার অবস্থানের অনিশ্চয়তা এবং ভরবেগের অনিশ্চয়তাকে যদি আমরা গুন করি তাহলে আমরা একটি মান পাবো। হাইজেনবার্গ প্রকাশ করেছেন, যে কোন কণার জন্য এই গুনফলের সর্বনিম্ন একটি মান আছে, যে কোন কণার ক্ষেত্রেই এর থেকে কম মান আমরা পাবো না। কিন্তু এর থেকে বেশী মান আমরা পেতে পারি। সেই মানটি হল h cut. তাহলে হাইজেনবার্গের সূত্রটিকে গানিতিকভাবে লেখা যায়, Δ X Δ P ≥ h cut/2

যেখানে, Δ X= অবস্থানের অনিশ্চয়তা বা পরিবর্তন Δ P= ভরবেগের অনিশ্চয়তা বা পরিবর্তনএখানে, h cut এর মান হল h/2 π. আমরা জানি h হল প্লাঙ্কের ধ্রুবক যার মান ৬.৬২৬ x ১০^-৩৪ জুল পার সেকেন্ড। কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর ক্ষেত্রে এই ধ্রুবকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক জায়গায় এর ব্যবহার রয়েছে। অর্থাৎ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি থেকে আমরা জানতে পারি যে, একটি কণার অবস্থানের পরিবর্তন এবং এর ভরবেগের পরিবর্তনের গুনফলের সর্বনিম্ন মান হবে h cut/ 2 অর্থাৎ তা কখনোই শূন্য হবেহাইজেনবার্গের এই অনিশ্চয়তা নীতি থেকে আমরা আরও জানতে পারি যে, অনেক বেশী ভরবেগ সম্পন্ন কণার সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা যেমন কঠিন ঠিক তেমনি একটি কণার অবস্থান যত নির্দিষ্ট করে আমরা নির্ণয় করার চেষ্টা করবো তার ভরবেগ নির্ণয় করা তত বেশী কঠিন হতে থাকবে। অর্থাৎ একটি কণার একটি নির্দিষ্ট সময়ে এর সঠিক অবস্থান এবং সঠিক ভরবেগ নির্ণয় করা শুধু কঠিনই নয় বরং অসম্ভব! র অনিশ্চয়তা নীতির লেজার রশ্মির হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির প্রমান পাওয়া যায়, একটি লেজার রশ্মির পরীক্ষায়। একটি পরীক্ষাগারে যদি. একটি লেজার রশ্মিকে আমরা একটি এক ছিদ্রবিশিষ্ট স্লিটের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করাই যা অপরপাশে রাখা পর্দায় একটি দাগ বা বিন্দু তৈরি করে। বিন্দুটির দৈর্ঘ্যও ছোট হতে থাকবে। স্লিটটির ছিদ্রের দৈর্ঘ্য কমাতে কমাতে এমন একটা পর্যায় আসবে যখন থেকে কোয়ান্টাম মেকানিক্স কাজ করা শুরু করবে বা হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি কাজ করা শুরু করবে। ছিদ্রের দৈর্ঘ্য আরও কমাতে থাকলে একসময় দেখা যাবে বিন্দুটি ছোট হতে হতে আবার দুই পাশে প্রশস্ত হয়ে দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং শুন্যে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিন্দুটির তো আরও ক্ষুদ্র হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যাওয়ার কথা! কিন্তু তা না হয়ে বিন্দুটিএর ব্যাখ্যা দেয়া যায় হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতি থেকে। যখন স্লিটের ছিদ্রের দৈর্ঘ্য আমরা কমাতে থাকবো তার মানে হবে সুত্রের  এর মান আমরা কমাচ্ছি অর্থাৎ কণার অবস্থান আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু ছিদ্রের দৈর্ঘ্য কমতে কমতে একটি সীমায় গিয়ে দেখা যাবে, যদি আমরা ছিদ্রের দৈর্ঘ্য আরও কমাই তাহলে ব্যাপারটি এমন দাঁড়াবে যে আমরা অনিশ্চয়তা নীΔ X Δ P ≥ h cut/2 সম্পর্কটি ভাঙতে যাচ্ছি। অনিশ্চয়তা নীতি বজায় রাখতে এখন যেটি দরকার তা হলো Δ এর অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাওয়া। ঠিক সে কারনেই আমরা দেখতে পাই যেX ডাইরেকশনে অনুভুমিক দিকে ভরবেগের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই স্লিটের ছিদ্রের দৈর্ঘ্য আরও কমাতে থাকলে অপরপাশে আপতিত ফোটনের ভরবেগের অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি পেয়ে আরও প্রশস্ত রেখা তৈরি করে। ছিদ্রের দৈর্ঘ্য যত কমানো হবে আপতিত রেখা তত বেশী প্রশস্ত হবে, অর্থাৎ হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতিকে প্রমাণ করে।

অনিশ্চয়তা নীতি আসলে কি এবং কেন ?

১৯২৭ সালে জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ উল্লেখ করেছিলেন, “কোন কণার অবস্থান এবং ভরবেগ একইসাথে নির্ভূলভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয় । এদের একটিকে যতটা নিখুঁত করা হবে, অন্যটি তত অনিশ্চিত হবে।উদাহরণস্বরূপ, পদার্থের কোন একটি কণা যেকোন মূহুর্তে ঠিক কোথায় আছে, তা জানার জন্য আমাদেরকে কণাটির উপর আলো ফেলতে হবে । যার সাহায্যে আমরা এর অবস্থান নির্ণয় করতে পারবো । ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক এর কোয়ান্টাম তত্ত্বমতে, ইচ্ছেমত বা ক্ষুদ্র পরিমাণ আলো ফেললেই হবেনা । অন্তত এক কোয়ান্টাম পরিমাণ আলো ফেলতে হবে কোয়ান্টাম পরিমাণ আলো ফেলে অবস্থান সঠিকভাবে মাপা গেল, তাতে কোন সমস্যা নেই । কিন্ত সেই অবস্থাতে কণাটির উপর আলো পড়ায় কণাটি উত্তেজিত হবে । ফলে কণাটির গতিপথ এমনভাবে পাল্টে যাবে যে, সেটা ভালভাবে দেখাও যাবেনা । এতে করে আমরা সঠিকভাবে তার ভরবেগ নির্ণয় করতে পারবোনযদি আলো না ফেলে চেষ্টা করি, সেক্ষেত্রে এর গতিপথ পরিবর্তন না ঘটার কারণে এর ভরবেগ সঠিকভাবে মাপা যাবে । কিন্তু সেক্ষেত্রে কণাটি স্পষ্টভাবে দেখা যাবেনা বিধায়, এর অবস্থান নির্ণয় করা সঠিক হবেনা তাহলে এই ভুলের পরিমাণ কত ? কণার অবস্থান এবং ভরবেগ নির্ণয়ের এই ত্রুটির সর্বনিম্ন পরিমাণ হবে, প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবকের মানকে ঐ কণার ভরের দিগুণ দিয়ে ভাগ করলে যে মান পাওয়া যায়, তার মানের সমাল্যাপ্লাসের লক্ষ্য ছিল, যেকোন একটি তাৎক্ষনিক সময়ে মহাবিশ্বের কণাদের অবস্থান এবং ভরবেগ জানা । কিন্তু হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির মাধ্যমে তার এই ইচ্ছের পতন ঘটেছিল হাইজেনবার্গের রহস্যময় অনিশ্চয়তা নীতিবলা হয়ে থাকে, মহাবিশ্বে নিহিত জ্ঞান ভান্ডার এতই প্রাচুর্যময় যে, তাতে এমন প্রশ্নও রয়েছে যার উত্তর এ জগতে পাওয়া যাওয়ার সীমিত জ্ঞানের অধিকারী মানব সাধ্যের বাইবিশেষ করে কোয়ান্টাম মেকানিক্সে হাইজেনবার্গের আনসার্টেইনিটি প্রিন্সিপাল বা অনিশ্চয়তা নীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা আমাদের বাহ্যিক জগত সম্পর্কে ধারনা কিছুটা বদলে দেয় এবং যা আমাদের মনে কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়, যার কিছু উত্তর আমাদের জানা আর কিছু অজানা।

(অসমাপ্ত ইনশাআল্লাহ)।

-লেখক, সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য, উইকিপিডিয়া।?

Published by

Chief Editor at Islamic Science-Tech Review
মহাবিশ্বের পারমাণবিক অবস্থান: মহাবিশ্বের সংঙ্গে আমাদের পরিচয় মূলত: স্থূল এবং সুক্ষ্ণ তথা দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য বস্তুর আঙ্গিকে। বস্ত্তত: পরমাণু ও পরমাণু দ্বারা গঠিত যৌগ পদার্থ দিয়ে এই মহাবিশ্ব গঠিত। আবার এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণুর অভ্যন্তরে ইলেকট্রন, প্রোটন ইত্যাদি মিলে ভিন্ন এক জগত মহাজগত রয়েছে। উনিশ শতকের প্রথম দিকে জন ডাল্টন পরমাণুবাদকে বেশ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। এ পরমাণুবাদের একটি স্বীকার্য ছিল, "সকল পদার্থ পরমাণু নামক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দ্বারা গঠিত।" উল্লেখ্য, গ্রীক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস ঈসাব্দপূর্ব ৪০০ অব্দে সর্বপ্রথম পদার্থের ক্ষুদ্রতম ‘কণা’ (atom)নিয়ে মতবাদ পোষণ করেন। ‘অ্যাটোমাস’ (atomas) শব্দ থেকে এটম (atom) শব্দটির বুৎপত্তি যার অর্থ অবিভাজ্য। অ্যারিষ্টটলের মতে, পদার্থসমূহ নিরবচ্ছিন্ন (continuous)একে যতই ভাঙ্গা হোক না কেন, পদার্থের কণাগুলো ক্ষুদ্র হতে ক্ষুদ্রতর হতে থাকবে। #

Comments

Popular posts from this blog

Madain Saleh (Cities of Saleh) in the Quran

RESEARCH

Muslim Scientists