মহাকর্ষঃ মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়! Gravity: the wonder of the universe!
মহাকর্ষঃ মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়!
Gravity: the wonder of the universe!
মহাকর্ষঃ মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়!
মহাকর্ষঃ মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়! -মুহাম্মাদ শেখ রমজান হোসেন
যাঁরা বিছানায় শুয়ে, বসে কিংবা মাটিতে দাঁড়িয়ে আছেন, এমনকি বিমানযোগে যাঁরা আকাশে উড়ছেন তাঁরা সবাই নিশ্চিত যে, আমরা সবাই পৃথিবীবাসী। কিন্তু বাস্তবে আমরা পৃথিবীর ভূত্বকের সাথে কত শতাংশ জড়িত? দু' পায়ে দাঁড়ালে কতটুকু, এক পায়ে দাঁড়ালে কতটুকু, লাফ দিলে কিংবা বিমানে উড়ে বেড়ালে কত শতাংশ আমরা মর্ত্য বা পৃথিবীবাসী? প্রশ্ন বটে। বাস্তবে আমাদের ভূ-ত্বকে সম্পর্ক দাঁড়ালে স্রেফ আমাদের পায়ের ত্বক ভূত্বকে স্পর্শের (টাচিং) সম্পর্কমাত্র। লাফালে বা উড়লে মোটেও না। তবুও আমাদের ক্ল্যাসিকাল (চিরায়ত) মিথ বা বদ্ধমূল ধারণা যে, আমরা মর্ত্যবাসী!
তবে আমাদের সবারই সাধারণ বিশ্বাস ( Common Faith) যে, আমাদের পৃথিবীর সাথে অতি নগন্য হলেও যে সংখ্যতার সম্পর্ক তার সাধারণ কারণ মধ্যাকর্ষণ শক্তি। এই মধ্যাকর্ষণ শক্তিই বায়ুর উর্ধ্বচাপ উপেক্ষা করে পৃথিবীর বুকে আমাদেরকে আঠার মতো আটকিয়ে রেখেছে। নচেৎ আমরা তুলার মতো কিংবা ধুলিকণার মত শুন্যে-মহাশুন্যে ভেসে বেড়াতাম নীড়হারা পাখির মতো আর কি !
উল্লেখ্য, মহাকাশে মধ্যাকর্ষণের স্থানীয় বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে মহাকর্ষ বল (Gravitation Force) ।
মহাকর্ষ বলের সংজ্ঞা
এ মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুকণা একে অপরকে যে বলে (Force) আকর্ষণ করে তাকে মহাকর্ষ বল (Gravitation Force) বলা হয়৷
যে কোন ভরের দুটো বস্তুর মধ্যে পরস্পর আকর্ষণকে সাধারণতঃ মহাকার্ষ বল বলা হয়। যদি বস্তু দুটোর মধ্যে একটা পৃথিবী হয় সেক্ষেত্রে আকর্ষিত বল-কে মধ্যাকর্ষণ বা অভিকর্ষ বল বলে।https://bn.quora.com/topic/মহাকর্ষ-ও-অভিকর্ষ
অর্থাৎ কোনো বস্তুকে পৃথিবী তার কেন্দ্রের দিকে যে বলে (Force) আকর্ষণ করে, তাকে অভিকর্ষ বল বলা হয়৷।
https://bn.quora.com/অভিকর্ষ-এক-ধরনের-মহাকর্ষ-বল
মহাকর্ষ সূত্র
মহাবিশ্বের যেকোনো দুটি বস্তুর মধ্যকার আকর্ষণ বলকে বিজ্ঞানীরা যে সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেছেন, সে সুত্রটিকে মহাকর্ষ সূত্র বলা হয়।
মহাকর্ষ বলের সূত্র = F=G×((m1×m2)÷r^2))
মহাকর্ষ বলের মান =6.63×10^-11 Nm^2kg^-2
সূত্রের ব্যাখ্যা: মহাবিশ্বের প্রত্যেকটি বস্তুকণা একে অপরকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে এবং এই আকর্ষণ বলের মান বস্তু দুটি মধ্যবর্তী ভরের গুণফল,
তাদের (বস্তু দুটির মধ্যের দূরত্ব) মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক এবং বস্তুদ্বয়ের সংযোগ সরলরেখা বরাবর ক্রিয়া করেউদাহরণ সরূপ মহাকর্ষ সূত্রটি হলঃ
F = G * ((m1 * m2) / r^2)
এখানে,
F = মহাকর্ষ বল G = গ্র্যাভিটেশনাল কনস্ট্যান্ট (6.67430 × 10^-11 N(m/kg)^2) m1 এবং m2 = দুটি বস্তুর মাস (একক: কেজি) r = দুটি বস্তুর মধ্যবর্তী দূরত্ব (একক: মিটার)
এই সূত্র দ্বারা নিউটন মহাকর্ষ বল নির্ণয় করা হয়। এটি দুটি বস্তুর মধ্যে মহাকর্ষ বল নির্ণয় করতে ব্যবহৃত হয়, যখন দুই বস্তু একই কাজে লেগে থাকে বা একই পথে চলে।
বিজ্ঞানীদের দাবীঃ মহাকর্ষই পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথের গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু মহাকর্ষকে কে নিয়ন্ত্রণ করছেন কেউ জানেন না। সূর্যে শক্তি নিঃসরণ বা মহাকাশের দানব কৃষ্ণগহ্বরও (Black Hole) তৈরিও হচ্ছে নাকি ওই মহাকর্ষ বলের কারণেই। তাই সত্যিই মহাকর্ষঃ মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়! কিন্ত্ত কেন? কিভাবে? প্রশ্ন বটে।
সবকিছুকে কোনো একক প্যাটার্নে খাপ খাওয়ানোর ইচ্ছা পদার্থবিজ্ঞানীদের অনেক দিনের। এর একটি কারণ, তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছুকে একত্র করে একটিমাত্র তত্ত্বের ভেতরে আনতে চান। অর্থাৎ একটিমাত্র তত্ত্ব দিয়ে মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করতে চান তাঁরা। একে বলা হয় সবকিছুর তত্ত্ব (Theory of Everything)। এই তত্ত্বের স্বপ্নদ্রষ্টা হচ্ছেন নোবেল বিজয়ী জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন। তবে বৈজ্ঞানিক এই চাওয়া-পাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা আইনস্টাইনেরই আবিস্কৃত মহাকর্ষ বল। এটাও আরেক বিস্ময়। কিন্তু কেন? কিভাবে?
সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ‘আইনস্টাইন ক্ষেত্র সমীকরণ’ (Einstein Field Equations in General Theory of Relativity)
এই তত্ত্বমতে, স্থানকালের বক্রতাই হল সত্যিকারের মহাকর্ষ। এই বক্রতা সৃষ্টি হয় স্থানকালে শক্তির উপস্থিতিতে। ভর নিজেও একপ্রকার শক্তি। তাই ভরশক্তির কারণে স্থানকালে বক্রতা সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য শক্তির উপস্থিতিতেও স্থানকালের ওপর একই প্রভাব থাকবে । গাণিতিকভাবে একে প্রকাশ করে সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের ‘আইনস্টাইন ক্ষেত্র সমীকরণ’ (Einstein Field Equations in General Theory of Relativity)। এই সমীকরণগুলিতে ‘রীমানীয় জ্যামিতি’ প্রয়োগ করে কোনো বিশেষ বস্তুর জন্য স্থানকালের বক্রতার বর্ণনা পাওয়া যায় ।
উল্লেখ্য, দূরবর্তী অবস্থানে পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে বৃহৎ বা ঘন বস্তুর কাছাকাছি ঘড়ি স্লো চলে কারণ এ ক্ষেত্রে কালের প্রবাহ স্লথ হয় যাকে 'কালের বক্রতা' বলা হয়। আবার, বৃহৎ বা ঘন বস্তুর কাছে স্থানের মাপন হ্রাসপ্রাপ্ত পায়। এই দু প্রক্রিয়া মিলে স্থানকালে বক্রতার সৃষ্টি হয়।
এই বক্র স্থানকালে চলমান একটি বস্তু স্থানকালে ক্ষুদ্রতম বিশ্বরেখায় চলে। এদের বলে ‘জিওডেসিক’ (Geodesic)। সমতল স্থানে ক্ষুদ্রতম পথ হল সরলরেখা। বক্র স্থানকালে ক্ষুদ্রতম পথগুলি অর্থাৎ জিওডেসিকগুলি বক্ররেখা। তাই মহাকর্ষ ক্ষেত্রে চলমান বস্তু সরলপথে চলতে চাইলেও দেখে মনে হয় বক্রপথে চলছে। একেই আমরা নিউটনীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে মহাকর্ষের প্রভাবে বস্তুর আবর্তন বলে মনে করি।
অর্থাৎ নিউটনীয় মহাকর্ষ তত্ত্ব আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষ তত্ত্বের একটি approximation। নিউটনের তত্ত্বে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মহাকর্ষ ক্ষেত্রের পরিমাপ করা যায় কিন্তু মহাকর্ষ আসলে কীভাবে কাজ করে তা জানা যায় না বা সবধরণের মহাকর্ষীয় ঘটনাবলী ব্যাখ্যা করা যায় না। (সূত্রঃ https://bn.quora.com/ মহাকর্ষ-বল-সংরক্ষণ শীল-বল)।
মহাবিশ্বের যেকোনো দুইটি বস্তুর মধ্যাকার আকর্ষন বলকে বলে যে মহাকর্ষ বলা হয় তা মূলতঃ একটি অস্পর্শ বল। অর্থাৎ এই বলে কোনো স্পর্শ হয় না। যেমন চৌম্বক বল। নির্দিষ্ট দুরত্বে আসার পর দুইটি চুম্বক একে অপরকে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করে থাকে। (সূত্রঃ https://bn.quora.com/অভিকর্ষ-এক-ধরনের-মহাকর্ষ-বল)।
প্রাচীনকালের মহাকর্ষ ধারণার স্বরূপ
খ্রিস্টের জন্মেরও কয়েক শ বছর আগের কথা। তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে একছত্র দাপট গ্রিক দার্শনিকদের। অ্যারিস্টোটলের নেতৃত্বে গ্রিক জ্ঞানের ঝাণ্ডা পত পত করে উড়ত তখনসেকালে পৃথিবীকে সমতল মনে করত মানুষ। তখন স্বাভাবিকভাবেই ওপর-নিচ-এর ধারণাটা ছিল পরম। মনে করা হত, যেসব বস্তু বা প্রাণী স্বর্গীয় তাদের অবস্থান ওপরে, স্বর্গপুরিতে। যেসব বস্তু স্বর্গীয় নয় তাদের অবস্থান মাটিতে কিংবা পাতালপুরিতে। যেসব বস্তু স্বর্গীয় নয় সেগুলোকে ওপর দিকে ছুঁড়ে মারলে একটা সময় আবার পৃথিবীতে ফিরতারপর এক সময় প্রমাণ হলো পৃথিবী সমতল নয়, গোলাকার। অ্যারিস্টোটল রীতিমতো যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেন পৃথিবী গোলাকার। তখন ওপর-নিচের অগের তত্ত্ব ভেঙে পড়ে। তাই পড়ন্ত বস্তু সম্পর্কে আগের ধারণা আর টেকেনি। বস্তু কেন ওপর দিকে ছুঁড়ে মারলে তা আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে তার নতুন সমাধান দরকার হয়। অ্যারিস্টোটল আরেকটা মতবাদ দেন। সেটা হলো—পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র। আকাশের সব গ্রহ-নক্ষত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সকল বস্তুর গতি তাই পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে। এজন্য বস্তুকে ওপর দিকে ছুঁড়ে মারলেও তা পৃথিবীতে ফিরে আসে।
সে কালে বৈজ্ঞানিক সমাধানের জন্য সরাসরি পরীক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার করা হত না। পণ্ডিতেরা যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত দিতেন, সেটাকেই সত্যি বলে বিবেচনা করা হতো। অ্যারিস্টোটলের আমলে মনে করা হতো, দুটো আলাদা ভরের বস্তুকে ওপর থেকে ফেললে একই সঙ্গে ভূমি স্পর্শ করবে করবে না। ভারি বস্তুটা আগে এবং হালকা বস্তুটা পরে মাটি স্পর্শ। এ ধারণা শিকড় গেঁড়ে ছিল মধ্যযুগ পর্যন্ত।
কথিত আছে লন্ডনে প্লেগ রোগ মহামারী আকার ধারণ করেছে। নিউটন প্লেগের হাত থেকে বাঁচতে লন্ডন ছেড়ে এক বাস করছেন গ্রামের বাড়িতে। সেখানেই তাঁর মাথায় মহাকর্ষ বলের কারণটা মাথায় আসে। সেটা ১৬৬৫ সালে। কাজ শুরু করেন সেটা নিয়ে। সঙ্গে ছিল গতিসূত্রের ব্যাখ্যা। দু বছর খেটেখুটে সেগুলো গণিতের ভাষায় লিখে ফেলন। জন্ম হয় কালজয়ী বই প্রিন্সিপিয়া অব ম্যাথমেটিকা। অদ্ভুত কারণে বইটি তিনি প্রকাশ করেন বিশ বছর পর। মহাকর্ষ, গতিসূত্র আর বলবিদ্যার আসল রহস্য তখন উন্মোচিত বিজ্ঞাননিউটনের মহাকর্ষ সূত্রের মূল সুর ছিল, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই পরস্পরকে আকর্ষণ করছে। এই আকর্ষণ বলের মান বস্তু দুটোর ভরের গুণফলের সমানুপাতিক। এবং দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপতিক। এই আকর্ষণ বলকে মহাকর্ষ বল বলে।
উল্লেখ্য, দুটি বস্তুর ভর যত বাড়ে, তত তাদের ভরের গুণফলের মানও বাড়ে। সুতরাং বস্তু দুটোর ভর যত বেশি হবে, তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল আকর্ষণ বলের মানও তত বাড়বে। আবার বস্তু দুটোর দূরত্ব যদি বাড়ে তবে তাদের মধ্যে আকর্ষণ বলের মান কমবে। এই কমার হার বর্গাকারে। অর্থাৎ দূরত্ব যদি বেড়ে দ্বিগুণ হয় তবে মহাকর্ষ বলের মান কমে আগের মানের এক চতুর্থাংশে নেমে আসবে।
(সূত্রঃ https://bn.quora.com/ মহাকর্ষ-বল-সংরক্ষণশীল-বল)।
মহাকর্ষ বলের দূর্বল সত্বার স্বরূপ
মহাবিশ্বের চারটি মৌলিক বলের মধ্যে মহাকর্ষই সবচেয়ে দুর্বল। কিন্তু কতটা দুর্বল? সেটি শুনলেও অনেকের চোখ কপালে উঠে যেতে পারে। মোটা দাগে বললে, অন্য তিনটি মৌলিক বলের তুলনায় প্রায় ১০৩৬ ভাগ দুর্বল এই মহাকর্ষ। অর্থাৎ ১/১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ ভাগ। এত বড় সংখ্যা উপলব্ধি করা সহজ নয়। একটু সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, আপনার কাছে একটি পেঁপে আছে। পেঁপেটা কেটে চার ভাগ করলে এর প্রতিটি টুকরা হবে পেঁপেটির এক–চতুর্থাংশ। পেঁপেটাকে ১০৩৬ (১/১,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০) ভাগ করা হলে প্রতিটি টুকরোর আকার হবে পেঁপের একটি অণুর চেয়েও ছোট। আর পেঁপের একটি অণুর সমান টুকরার আকার করতে চাইলে আপনাকে প্রায় ২০ লাখ পেঁপে কেটে সমান ভাগে টুকরা করতে হবে। বোঝা গেল, ব্যাপারটা?
মহাকর্ষের স্বভাব নাকি নিজের দিকে টানা। অথচ ভূমিকা রাখছে চাপার-এটিও আরেক বিস্ময়। মহাকর্ষ মহাকাশে যেন স্বঘোষিত রাজা-মহারাজা। কিন্তূ পৃথিবীর ভূত্বকে এক অসহায় প্রজা। কত অসহায় তার প্রমাণ নিম্নরূপ পরীক্ষায় পাওয়া যেতে অন্যান্য বলের তুলনায় মহাকর্ষের দুর্বলতা কতটুকু, তা বুঝতে আরেকটা পরীক্ষা করা যায়। সে জন্য দরকার হবে একটি চিরুনি ও ছোট ছোট টুকরা করে কাটা কিছু কাগজ। শুকনা চিরুনিটা দিয়ে আপনার মাথার শুকনো চুল কিছুক্ষণ আঁচড়ে কাগজের টুকরার কাছে ধরুন। দেখা যাবে, কাগজের টুকরাগুলোকে চিরুনিটা আকর্ষণ করছে। কিছু কাগজ চিরুনির সঙ্গে লেগেও যাবে। এর কারণ স্থির বিদ্যুৎ। চিরুনির সামান্য বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলও কাগজের টুকরাগুলোকে চিরুনির সঙ্গে আটকে রাখে। অথচ কাগজের টুকরাগুলোর ওপর পৃথিবীর মহাকর্ষ কাজ করছে। কিন্তু গোটা পৃথিবীর মহাকর্ষও চিরুনির সেই আকর্ষণ ঠেকাতে পারছে না। এতে বোঝা যায়, বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের তুলনায় মহাকর্ষ কত দুর্বল। একটি ছোট চুম্বক লোহাজাতীয় কিছুর কাছে ধরলে তা বিশাল পৃথিবীর মহাকর্ষকে বুড়ো আঙুল দেখাবে। তাই মহাকর্ষ একদিকে যেমন মহারাজা অন্যদিকে মহা অসহায়ও। এ কারণেও মহাকর্ষ মহাবিস্ময় !
মহাকর্ষ সম্পর্কে জার্মান পদার্থ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনঃ
►আইনস্টাইন মনে করেন, সব ধরণের শক্তিই হলো মহাকর্ষের উৎস। কারণ সব শক্তিরই একটা কার্যকর ভর রয়েছে। (বিজ্ঞানচিন্তা, জানুয়ারি, ২০২১,পৃষ্ঠা ৬৩)।
►ভরশক্তির সমীকরণ মতে, জমে থাকা শক্তি জমাটবদ্ধ বস্তুর মতই (আইনস্টাইন)।
►ভর এবং শক্তিঃ সব শক্তিরই একটা কার্যকর ভর রয়েছে” (আইনস্টাইন)। (বিজ্ঞানচিন্তা, জানুয়ারি, ২০২১,পৃষ্ঠা ৬৩)
►ভর ভেক বদল করে শক্তিতে রূপান্তিরত হয় (বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২০,পৃষ্ঠা ২০)।
►মহাকর্ষীয় ভর বলে আমরা যেটাকে জানি, যার কারণে আমাদের ভারী ও হালকা অনুভূতি হয়, সেটা আসলে ওজন (ভর নয়) (বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২০, বর্ষ ৪, সংখ্যা ০৬, পৃষ্ঠা ২০)।
►মহাকর্ষ বল শুন্য কোনো স্থানের কল্পনা করাও অসম্ভব (বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২০,পৃষ্ঠা ২১)।
►“মহাকর্ষ বলের প্রাবল্য যেখানে কম, সেখানে আপনার ওজন কম হবে, নিজেকে তত হালকা মনে করবেন আপনি। আর মহাকর্ষ প্রাবল্য খুব বেশি যেখানে, সেখান থেকে পা তুলতেই আপনি হিমশিম খাবেন” (বিজ্ঞানচিন্তা, মার্চ, ২০২০,পৃষ্ঠা ২১)।
যে কারণে মহাকর্ষ কোয়ান্টাম মেকানিক্সে ব্যাখ্যার অতীত
কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা না করতে পারার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মহাকর্ষকে খাপ খাওয়াতে গেলে মহাকর্ষও কোনো কণার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় বলে কল্পনা করে নিতে হয় (বিজ্ঞানচিন্তা)।
যে কারণে বৃহৎ পরিসরে বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের মতো মহাকর্ষকে বাতিল করা যায় না
মহাকর্ষের মান সংশ্লিষ্ট বস্তুর ভরের সঙ্গে সম্পর্কিত অর্থাৎ বস্তুর ভরকে মহাকর্ষের চার্জ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, যার মাধ্যমে বস্তুটি কতটুকু মহাকর্ষ অনুভব করবে, তা নির্ধারিত হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, মহাবিশ্বে শুধু এক ধরনের ভরই দেখা যায়। ঋণাত্মক বা নেগেটিভ ভর বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। কাজেই কোনো কণা বা বস্তুকে মহাকর্ষ বিকর্ষণ করে না।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর মানে দাঁড়ায়, মহাকর্ষকে বাতিল করা যায় না। অথচ বৃহৎ পরিসরে বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বল পরিত্যক্ত হতে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, সূর্যের বেশির ভাগ যদি ধনাত্মক বৈদ্যুতিক চার্জ দিয়ে গঠিত হতো এবং পৃথিবী যদি বেশির ভাগ ঋণাত্মক চার্জ দিয়ে গঠিত হতো, তাহলে এই দুইয়ের মধ্যে যে আকর্ষণ দেখা যেত, তার পরিমাণ হতো বিপুল। তাহলে আমাদের গ্রহটাকে অনেক আগেই সূর্য গিলে ফেলত। কিন্তু পৃথিবী গঠিত হয়েছে প্রায় সমপরিমাণ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জ দিয়ে। আবার সূর্যও গঠিত হয়েছে সমপরিমাণ ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জে। তাই তারা বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয়ভাবে পরস্পরকে সেভাবে প্রভাবিত করে না। পৃথিবীর প্রতিটি ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণার উভয়েই সূর্যের ধনাত্মক ও ঋণাত্মক কণা দিয়ে আকর্ষিত ও বিকর্ষিত হয়। তাই এ ক্ষেত্রে সব বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বল বাতিল হয়ে যায়। এক মুখীতা অর্থাৎ শুধুই আকর্ষণের কারণে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম মহাকর্ষ যা বমহাবিশ্বের জন্মের শুরুর দিকে (মহাবিশ্বের বয়স তখন প্রায় চার লাখ বছর) প্রায় সব পদার্থই কার্যত চার্জনিরপেক্ষ পরমাণুতে এসে স্থির হয়েছিল। এভাবে ভারসাম্যে এসেছিল বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বল।তারপর থেকে পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে কোনো বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বল আর অবশিষ্ট নেই। আবার দুর্বল ও শক্তিশালী পারমাণবিক বল বৃহৎ পরিসরে কাজ করতে পারে না। তাই চারটি বলের মধ্যে একটি বলই বাকি থাকে, আর সেটি মহাকর্ষ। আকর্ষণধর্মী হওয়ার কারণে গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথগুলোকে বৃহৎ পরিসরেও ভূমিকা রাখে মহাকর্ষ। তাই বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় বলের মতো বৃহৎ পরিসরে মহাকর্ষকে কখনো বাতিল করা যাচ্ছে না যা বিস্ময়কর বটে !
সুতরাং মহাকর্ষের দুটি কৌতূহলী ও অমীমাংসিত ধর্ম দেখা যাচ্ছে। প্রথমটা হলো অন্য বলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এই বলটা খুবই দুর্বল। দ্বিতীয়ত, বলটা শুধু আকর্ষণ করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কণার চার্জের ওপর নির্ভর করে অন্য বলগুলো আকর্ষণ, বিকর্ষণ দুটিই করে। দেখা যাচ্ছে, নানা দিক দিয়ে মহাকর্ষ বেশ অস্বাভাবিক। তাহলে প্রশ্ন আসে, মহাকর্ষ এ রকম আলাদা কেন? এর একমাত্র উত্তর, আমরা জানি না (বিজ্ঞানচিন্তা)।
দ্বিতীয় অধ্যায়
মহাকর্ষ তরঙ্গঃ প্রাসঙ্গিক কথা
মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বিষয় হতে পারে মহাকর্ষ। প্রত্যেক বিষয়ের কোনো না কোনো প্রকারে একটা যুক্তি খাড়া করা যায় ব্যতিক্রম মহাকর্ষ ও তার প্রতি বল গ্রাভিটন। তাই স্ট্রেন্জ কোয়ার্কের মতই মহাকর্ষের নাম দেয়া যেতে পারে স্ট্রেন্জ ফোর্স।
সব কণা, পদার্থ এবং অন্য তিনটি মৌলিক বলকে ব্যাখ্যা করা হয় কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে। কোয়ান্টাম মেকানিকসে সবকিছুকে কণা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এমনকি বলগুলোকেও কণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় এ তত্ত্বে। যেমন একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনকে ধাক্কা দেওয়ার কারণে দ্বিতীয় ইলেকট্রনটির যে চলাচল হয়, তার জন্য কোনো বল বা অদৃশ্য কোনো প্রভাব ব্যবহার করা হয় না। বরং পদার্থবিদেরা মনে করেন, এই মিথস্ক্রিয়ার কারণ একটি ইলেকট্রন আরেকটি ইলেকট্রনের দিকে একটি কণা ছুড়ে দেয়, যার মাধ্যমে তার কিছু ভরবেগ স্থানান্তরিত হয়। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রে বলবাহী এই কণাকে বলা হয় ফোটন। অন্যদিকে দুর্বল বলের বলবাহী কণার নাম ডব্লিউ ও জেড বোসন। এই বলবাহী কণা বিনিময়ের মাধ্যমে দুর্বল বল কাজ করে। আর শক্তিশালী বল বিনিময় হয় গ্কোয়ান্টাম মেকানিকসের এই কাঠামোকে বলা হয় কণাপদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল। এই মডেল প্রাকৃতিক জগতের অধিকাংশকে ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য রকম সফল। কোয়ান্টাম কণার দৃষ্টিভঙ্গিতে জগতের অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা যায়। এমনকি আমরা আগে দেখিনি এমন অনেক কিছুর ভবিষ্যদ্বাণীও করা যায়। যেমন এই মডেল ব্যবহার করেই হিগস বোসন কণার ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে ২০১২ সালে কণাটি শনাক্ত করাও সম্ভব হয়েছে। আবার দুর্বল বল কেন ক্ষুদ্র পরিসরে কাজ করে, তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যায় এ মডেল থেকে। আসলে এ বলবাহী কণার ভর অনেক বেশি। সে কারণে কণাটির চলাচল সীমাবদ্ধ। এত সফলতা সত্ত্বেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, একই উপায়ে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। কিন্তু কেন?
কোয়ান্টাম মেকানিকসের মাধ্যমে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা না করতে পারার দুটো কারণ রয়েছে। প্রথমত স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মহাকর্ষকে খাপ খাওয়াতে গেলে মহাকর্ষও কোনো কণার মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয় বলে কল্পনা করে নিতে হয়। পদার্থবিদেরা এই হাইপোথেটিক্যাল কণার একটি গালভরা নামও দিয়েছেন—‘গ্র্যাভিটন’। বাংলায় বলা যায় মহাকর্ষ কণা। এ কণার অস্তিত্ব যদি সত্যিই থাকে, তাহলে আপনি শুয়ে, বসে বা দাঁড়িয়ে যেখানেই থাকুন না কেন, আপনার দেহ থেকে অনবরত অতিক্ষুদ্র বলের মতো গ্র্যাভিটন কণা ছুটে যাচ্ছে ভূপৃষ্ঠের দিকে। আবার ভূপৃষ্ঠ থেকেও একই রকম কোয়ান্টাম কণা ছুটে আসছে আপনার দিকে। এই দুই মহাকর্ষ কণা বিনিময়ের কারণে আপনি পৃথিবীর বুকে আটকে থাকতে পারছেন। আবার পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘুরে বেড়াতে পারছে, তার কারণও ওই গ্র্যাভিটন কণার অবিরাম স্রোত দুইয়ের মধ্যে বিনিময় হচ্ছে। এভাবে মহাকর্ষকে বেশ ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু এ ধারণার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গ্র্যাভিটনের অস্তিত্ব পুরোটাই কাল্পনিক। বাস্তবে এ রকম কোনো কণার খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। অন্য বলগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের এই আপাত–অসংগতির অর্থ হতে পারে, আমরা যে প্যাটার্ন আবিষ্কার করেছি, সেটি সঠিক নয়, অথবা বড় কোনো কিছু আমরা এখনো বুঝতে পারছি না। কোনটা ঠিক? তা–ও অমীমাংসিত।
দ্বিতীয় কারণটি হলো, মহাকর্ষকে ব্যাখ্যার জন্য আমাদের কাছে চমৎকার ও কার্যকর একটি তত্ত্ব আছে। সাধারণ আপেক্ষিকতা। ১৯১৫ সালে তত্ত্বটি প্রণয়ন করেন আইনস্টাইন। তারপর থেকে নানাভাবে নিজের সফলতার পরিচয় দিয়েছে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। এ তত্ত্বে মহাকর্ষকে দুটি বস্তুর মধ্যে কোনো বলের টান হিসেবে ভাবা হয় না, বরং ভাবা হয় স্থানের বিকৃতির ফল হিসেবে। এর মানে কী? আইনস্টাইন স্থানকে পরম না ধরে গতিশীল প্রবাহ বা নমনীয় চাদরের মতো করে কল্পনা করলেন। এভাবে মহাকর্ষকে সরলভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এ তত্ত্ব বলে, কোনো বস্তু বা শক্তির উপস্থিতিতে তার চারপাশের নমনীয় চাদরের মতো স্থান বেঁকে যায়। এতে বস্তুটির কাছের বস্তুগুলোর গতিপথ বদলে যায়। আইনস্টাইনের চিত্রমতে, মহাকর্ষ বল বলে কিছু নেই, আসলে পুরোটাই স্থানের বিকৃতি বা বক্রতার ফল।
নিউটন বলেছিলেন, মহাকর্ষ বলের টানে পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরছে। কিন্তু আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী, পৃথিবী সে কারণে সূর্যের চারপাশে ঘুরছে না। এর আসল কারণ সূর্য তার চারপাশের স্থানকে বাঁকিয়ে দিয়েছে। তাই পৃথিবীর কাছে যেটা সরলপথ, সেটি আসলে একটি বৃত্তাকার পথ (বা উপবৃত্তাকার) বলে মনে হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মহাকর্ষীয় ভর কোনো চার্জ নয়, বরং কোন বস্তু তার চারপাশের স্থানকে কতটুকু বক্র করতে পারে তার পরিমাণ। তত্ত্বটাকে যতই উদ্ভট বলে মনে হোক না কেন, এটা স্থানীয় মহাকর্ষ, মহাজাগতিক মহাকর্ষ এবং মহাবিশ্বের অনেক অদ্ভুত পরিঘটনা সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। এ তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে, আলো কেন বস্তুর চারপাশে বেঁকে যায় এবং আপনার জিপিএস কেন কাজ করে। এমনকি কৃষ্ণগহ্বরের ভবিষ্যদ্বাণী করে তত্ত্বটি।
সমস্যা হলো সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব বেশ ভালোভাবে মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করতে পারে। তাই আমাদের ধারণা হয়েছে, এটাই সম্ভবত প্রকৃতির সঠিক ব্যাখ্যা। ঝামেলা হলো এ তত্ত্বটাকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মতো অন্য কোনো মৌলিক তত্ত্বের সঙ্গে একত্র করা সম্ভব হয়নি। অথচ কোয়ান্টাম মেকানিকসও প্রকৃতির সঠিক ও নির্ভুল ব্যাখ্যা করতে পারে বলে আমরা মনে করি।
সমস্যাটার কারণ কোয়ান্টাম মেকানিকস অনুযায়ী, মহাবিশ্বের চিত্র একটু আলাদা। এ তত্ত্বে স্থানকে সমতল পটভূমি হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুসারে, স্থান গতিশীল ও নমনীয়, যা সময়ের সঙ্গে মিলে স্থান-কাল গঠন করে। কাজেই বস্তুর ভর বা শক্তি স্থান-কালকে বাঁকিয়ে দিতে পারে। তাহলে প্রশ্ন আসে, কোন চিত্রটা সঠিক? মহাকর্ষ কি স্থানের বক্রতা নাকি কণার মধে৵ অজানা উড়ন্ত কোয়ান্টাম বল? মহাবিশ্বের সবকিছুই আসলে কোয়ান্টাম মেকানিকসের নিয়ম মেনে চলে। তাই মহাকর্ষও যদি সেই নিয়ম মেনে চলে, তাহলে বিষয়টা আমাদের জন্য বোধগম্য হয়ে উঠত। কিন্তু গ্র্যাভিটন বা মহাকর্ষ কণা এখন পর্যন্ত কাগজে–কলমেই সীমাবদ্ধ।
অসীমের পথে কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি বা কোয়ান্টাম মহাকর্ষ তত্ত!
কোয়ান্টাম মেকানিকস এবং আপেক্ষিকতার মিলনে নতুন যে তত্ত্ব পাওয়া যাবে, তার পোশাকি নাম কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি বা কোয়ান্টাম মহাকর্ষ। কিন্তু সমস্যা হলো সেটি কেমন হবে? কেউ জানে না। পদার্থবিজ্ঞানীরা মাঝেমধ্যে তাত্ত্বিকভাবে এ ধরনের কণার ভবিষ্যদ্বাণী করেন, পরে সেগুলো পরীক্ষামূলকভাবে পাওয়া যায়। সম্প্রতি লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে পাওয়া হিগস বোসন এমন একটি কণা। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকস আর আপেক্ষিকতাকে একীভূত করতে পদার্থবিদেরা এখন পর্যন্ত যতবার চেষ্টা করেছেন, ততবারই ব্যর্থ হয়েছেন। এসব চেষ্টায় অসীমের মতো কিছু ফল পাওয়া গেছে।
পৃথিবীতে প্রবাহমান বাতাস উৎপত্তিতে মহাকর্ষের ভূমিকা
কখনো ভেবে দেখেছেন, প্রবাহমান বাতাস কীভাবে তৈরি হয়? বাতাসটা আসেই-বা কোত্থেকে? প্রশ্ন হলোঃ বাতাস জিনিসটা আসলে কী?
“আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখি, সবই আসলে অণু-পরমাণুর ভিন্ন ভিন্ন রূপ। পদার্থের অণু যখন খুব কাছাকাছি থাকে, তখন কঠিন অবস্থা তৈরি হয়। একটু দূরে দূরে থাকলে তরল, আর বেশ দূরে দূরে থাকলে তৈরি হয় পদার্থের গ্যাসীয় অবস্থা। বাতাস মূলত বিভিন্ন পরমাণুমিশ্রিত একটি গ্যাসীয় অবস্থা। এই গ্যাসীয় অবস্থার প্রবাহকে আমরা বলি বাতাস বয়ে যাওয়া” (সূত্রঃবাতাস আসে কোথা থেকে:আব্দুল্লাহ আল মাউল্লেখ্য, পদার্থ কোন অবস্থায় থাকবে, তা নির্ভর করে মূলত দুটি বিষয়—তাপ ও চাপের ওপর। একই তাপ ও চাপে আবার সব পদার্থের ভৌত অবস্থা (কঠিন, তরল ও বায়বীয়) একরকম হয়পদার্থের অবস্থা যা-ই হোক না কেন, সেটা মহাকর্ষ দ্বারা প্রভাবিত হয়। পৃথিবীতে সব পদার্থই ওপর থেকে নিচের দিকে পড়ে। অর্থাৎ অভিকর্ষের দিকে। অভিকর্ষের দিক কোনটা? সাধারণভাবে বলা যায়, নিচের দিক। তবে একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যাবে, অভিকর্ষ বলটা কাজ করে কম অভিকর্ষ থেকে বেশি অভিকর্ষের দিকে। তরল পদার্থের বেলায় অভিকর্ষের দিকে এই প্রবাহ খুব ভালো করে দেখতে পাই আমরা। নদীনালার প্রবাহ (কারেন্ট) সৃষ্টির প্রধান কারণ এই অভিকর্ষ। সমুদ্র যে পানিতে ভর্তি, তার কারণও অভিকর্ষ। তরল পদার্থ যেমন উঁচু স্থান থেকে নিচু স্থানে প্রবাহিত হয়, বায়বীয় পদার্থ তেমন উচ্চ চাপের জায়গা থেকে নিম্ন চাপের দিকে প্রবাহিত হয়। অআবহাওয়ার পরিভাষায় নিম্নচাপ বলতে সাধারণতঃ ঘূর্ণঝড়ের পূর্বাভাষকে বুঝানোপ্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, তরল পদার্থের প্রবাহের ক্ষেত্রে চাপের ভূমিকা থাকে, আর বায়বীয় পদার্থ প্রবাহের বেলায় থাকে অভিকর্ষের ভূমিকা। পৃথিবীতে তাপ আসে মূলত সূর্য থেকে। অর্থাৎ সূর্যের তাপে বায়ুমণ্ডল উত্তপ্ত হয়। আমরা জানি, পৃথিবীর সব জায়গায় সমানভাবে সূর্যের আলো পড়ে না। ফলে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সবজায়গায় সমানভাবে উত্তপ্ত হয় না। তাই বায়ু চাপও সব জায়গায় সমান হয় না। চাপের এই অসম বন্টনে সমতা আনতেই অনেকটা সাগরে সৃষ্ট জোয়ার-ভাটার ন্যায় তৈরি হয় বায়ুপ্রবাহ। অসম তাপমাত্রা যেহেতু সব সময়ই থাকে পৃথিবীজুড়ে, তাই বায়ুপ্রবাহ কখনো থামে না। তাপমাত্রার তারতম্যে কম-বেশি হলে বাতাসের শক্তিও কম-বেশি হয়। এ কারণে বাতাসের গতি স্বাভাবিক আবহাওয়ায় এক রকম, নিম্নচাপেপ্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা হঠাৎ করে অনেক বেড়ে গেলে সেখানকার বায়ু বেশ হালকা হয়ে যায়। হালকা বায়ু দ্রুত ওপরে উঠে গেলে ওই অঞ্চলে তৈরি হয় একধরনের শূন্য স্থান। এই শূন্যতা পূরণ করতে চারপাশ থেকে অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাস ছুটে আসে। তৈরি হয় প্রচণ্ড ঘূর্ণিপাক। এই ঘূর্ণিপাককেই বলে ঘুর্ণিঝড় বা টপৃথিবীতে আমরা যে বাতাস অনুভব করি, সেটা মূলত অণু-পরমাণুর গ্যাসীয় অবস্থায় একধরনের প্রবাহ। পানি চক্র, উদ্ভিদের প্রস্বেদন-আস্বাদন, প্রাণীর শ্বাস-প্রশ্বাস ও ধূলিকণার কারণে বায়ুমণ্ডলে নতুন কণা যুক্ত হয় বা হ্রাস পায়। এই কণা প্রবাহের জন্য প্রয়োজন তাপশক্তি। সূর্যের কারণেই এই প্রবাহ তৈরি হয় পৃথিবীতে। অর্থাৎ বাতাস বয়। মোটা দাগে বায়ুশক্তিকে তাই আমরা সৌরশক্তির একটি রূপ বলে দাবি করতে পারি।সূত্র: দ্য কনভারশেসনhttps://www.bigganchinta.com/physics/8sমহাকর্ষ বল কিভাবে সৃষ্টি হয়?মহাকর্ষ বলের সৃষ্টির পিছনে এখনও পর্যন্ত কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, এটি এখনো পর্যন্ত মহাজাগতের সবচেয়ে রহস্যময় বল।
মহাকর্ষের আলোকে ভর বনাম ওজন
ভর হচ্ছে কোনো বস্তুর ভেতরে উপস্থিত মোট পদার্থের পরিমাণ। আর ওজন হচ্ছে ঐ পরিমাণ পদার্থকে পৃথিবী বা কাঠামো কত gravitational force এ নিজের দিকে টানছে। ওজন মূলত ভরেরই গুণক রাশি। ভরকে(m) অভিকর্ষজ ত্বরণ (g) দ্বারা গুণ করলেই ওজন (W) পাওয়া যাবে।
চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞানের মতানুসারে ভর অপরিবর্তনশীল। কিন্তু আপেক্ষিকতার সূত্রানুযায়ী কোনো বম্তু আলোক বেগের কাছাকাছি কোনো বেগে অনবরত চলতে থাকলে তার গতিশীল ভর স্থিতিশীল ভর অপেক্ষা সম্প্রসারিত হয় অর্থাৎ বাড়তে থাকে। আর আলোর বেগে পৌঁছলে ভর হয় অসীম যা আর পরিমাপ করা যায় না।
যাই হোক, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে স্থিতিশীল কাঠামোতে বস্তুর ভর অপরিবর্তনশীল। অর্থাৎ পৃথিবীতে 1 kg ভরের কোনো বস্তুর ভর চাঁদেও 1 kg, মঙ্গলেও।
ওজন পরিবর্তিত হবে, কারণ ওজন gravity বা অভিকর্ষজ ত্বরণের উপর নির্ভর করে এবং আমরা সবাই জানি যে স্থানভেদে gravity পরিবর্তনশীল।পৃথিবীতে gravity 9.807 ms^-2(প্রায়), চাঁদে 1.62 ms^-2 এবং মঙ্গলে 3.711 ms^-2.
তাহলে, 1 kg ভরের বস্তুর উপর W=mg সূত্র প্রয়োগ করে পাই,
পৃথিবীতে ওজন, We=1 kg x 9.807 ms^-2=9.807 N.
অনুরূপভাবে, চাঁদে ওজন Wm= 1.62 N এবং মঙ্গলে WM= 3.711 N.
সুতরাং, পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গলে বস্তুটিকে হালকা মনে হবে এবং চাঁদে মঙ্গলের তুলনায়ও হালকা লাগবে।
কারো মতে, যে কোন ভরের দুটো বস্তুর মধ্যে আকর্ষণকে মহাকার্ষ বলে। এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করে কারো মতে, ২টি বস্তুর পারস্পরিক আকর্ষণ যদি মহাকর্ষ হয় তাহলে পৃথিবী চাঁদ-কে এবং সূর্য পৃথিবীকে টেনে নিত। কিন্তু পরস্পরের টানা টানির মধ্যেও চাঁদ পৃথিবীর আকর্ষণকে উপেক্ষা করে পৃথিবী সূর্যের আকর্ষণকে উপেক্ষা করে কিভাবে স্ব স্ব অবস্থানে টিকে আছে। মহাকাশে মহাকর্ষের রহস্যজনক ভূমিকার বিষয়টি আইজ্যাক নিউটনের উপলদ্ধি করে জীবন সায়াহ্নে এসে এক প্রাতঃস্মরণীয় বক্তব্যে বলেনঃ
* মহাকর্ষ সবসময় আমাদের এটি ব্যাখ্যা করতে পারে যেঃ গ্রহগুলো কিভাবে ঘুরছে। কিন্তু এটি ব্যাখ্যা করতে পারে না যেঃ কে গ্রহগুলোকে এই অবস্থায় রেখেছেন?
* আমরা সাদা চোখে কটি পানির কণা সম্পর্কেই জানতে পারি কিন্তু বিশাল সমুদ্র সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সামান্যই।
* পৃথিবীর এই বিপুল জ্ঞানভাণ্ডারকে জানার ক্ষেত্রে আমি সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এক শিশুর মতো, যে শুধু সারাজীবন নুড়িই কুড়িয়ে গেল। সমুদ্রের জলরাশির মতো বিশাল এই জ্ঞান আমার অজানাই থেকে গেল।
* সূর্য ও পৃথিবীর মাঝখানে মহাকর্ষ বল এমনভাবে থাকে, যেন অদৃশ্য কোনো দড়ি এই বস্ত্ত দুটিকে বেঁধে রাখার ফলে সুর্যের চারপাশের কক্ষপথে চিরকালের জন্য বাধা পড়ে পৃথিবী।
গ্যালিলির হাত ধরে আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের জন্ম। জন্ম আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানেরও। গ্যালিলিও প্রকৃতির সামান্য কিছু রহস্য উন্মোচন করেছিলেন। পদার্থবিজ্ঞান গবেষণায় সত্যিকারের গতি আসে সর্বকালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনের হাত ধরে। তাঁর গতিসূত্র আর মহাকর্ষ সূত্রের আবিষ্কারই পদার্থবিজ্ঞানের বৈপ্লবিক সূচনা।মহাকর্ষ বল আবিষ্কারে কি নিউটনের ভূমিকাই মূখ্য? তার আগে কি আর কেউ এ কথা ভাবেনি। অনেকেই ভেবেছিল, কিন্তু সে ভাবনা-চিন্তাগুলোয় অনেক ফাঁক-ফোঁকর ছিল। নিউটন সেসব ফাঁক-ফোকর বুঁজিয়ে মহাকর্ষ বলকে একটা স্থায়ী কাঠামোর ওপর দাঁড় করিয়ে দেন।
আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতায় ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আলো বেঁকে বসার ব্যাপারটি। এই ব্যাখ্যায় ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্বের একটা আলামত ছিল কিন্তু যে বল আমাদেরকে পৃথিবীর বুকে আটকে রাখছে সে বলের ব্যাপারে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতায় মহাবিশ্বকে নরম চাদর রূপে তুলনা করে তন্মধ্যে অতিভর সম্পন্ন ব্ল্যাকহোল জাতীয় বস্তুর অস্তিত্ব ছাড়া কেন চরকা কিংবা নাগরদোলার মতো দোলার পরও পৃথিবী ছিটকে মহাশুন্যে পড়ছে না কিংবা প্রশান্ত-অআটল্যান্টিকের সব পানি মহাশুন্যে ঢলকে পড়ছে না এব্যাপারে সাধারণ আপেক্ষিকতায় তেমন কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। তবে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন এর ধারণা অনুযায়ী স্পেস বা মহাকাশ একটি টান করা রাবার এর চাদরের মত, এতে নক্ষত্র, গ্রহের মত বড় বড় ভর নিমজ্জিত আছে যা এই স্পেস কে বিকৃত করে, ফলে অপেক্ষাকৃত কম ভর যুক্ত বস্তু গুলি এদের চার পাশে ঘুরতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ঘুরে ঘুরে গতি হারিয়ে এদের কেন্দ্রে এসে পড়ে। এই ব্যাখ্যাটা অবশ্য সব বিজ্ঞানীদের মনঃপুত ছিল না। তাই বিকল্প পথে মহাকর্ষের রহস্য উন্মোচনে এখনও বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট তৎপর।
যা একেবারে ভুতুড়ে ব্যাপার!
মহাকর্ষ তরঙ্গ তার চলার পথে সামনে যা পায়, তাকেই সংকুচিত ও প্রসারিত করতে করতে এগিয়ে যায়। তাই মহাকর্ষ তরঙ্গের সামনে একটি বৃত্ত পরিণত হয় উপবৃত্তে, বর্গ পরিণত হয় আয়তক্ষেত্রে। মহাকর্ষ তরঙ্গস্থানকে বিকৃত করে ১০/-২০ (10/-20) গুণ। এর মানে হলো আপনার কাছে ১০/+২০ (10/+20) মিলিমিটার লম্বা একটি লাঠি থাকে, আর তার ভেতর দিয়ে মহাকর্ষ তরঙ্গ চলে যায়, তাহলে লাঠিটা ছোট হবে মাত্র ১ (এক) মিলিমিটার। এই সংকোচন এতই ছোট যে তা শনাক্ত করা বেশ কঠিন যা একেবারে ভুতুড়ে ব্যাপার!
মহাকর্ষকে ভালোভাবে জানতে হলে
মহাবিশ্বের মহা বিস্ময় মহাকর্ষকে ভালোভাবে জানতে হলে প্রয়োজন কোয়ান্টাম মহাকর্ষের পাশাপাশি মহাকর্ষ তরঙ্গেরও। এই তরঙ্গ অবশ্য মহাকর্ষের প্রতিবল বিজ্ঞানীদের স্বপ্নিল গ্র্যাভিটন কণা নয়- মর্মে বিজ্ঞানীরা আগাম জানিয়েছেন। যেমন স্টিফেন হকিং আগাম জানিয়েছিলেন, মহাবিশ্বের উদ্ভবের পেছনে কারণের কারণ মহাকারণ হচ্ছে মহাকর্ষযাইহোক, বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করার উপায়ও বের করেছেন। এমনই পরীক্ষা চালানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের । লাইগোর পূর্ণ রূপ লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি (লাইগো)তে। সেখানে চার কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দুটি টানেল পরস্পরের সমকোণে স্থাপন করা হয়েছে। টানেলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্বের পরিবর্তন মাপার জন্য আছে একটি লেজার। মহাকর্ষ তরঙ্গ এর ভেতর দিয়ে চলে গেলে সেখানকার স্থান একদিকে প্রসারিত হয়, আবার অন্যদিকে সংকুচিত হয়। তার প্রভাব টানেলের লেজার রশ্মিতেও পড়ে। লেজার রশ্মির ব্যতিচার পরিমাপ করে পদার্থবিদেরা নিশ্চিত হন, কোনো মহাকর্ষ তরঙ্গ সেখানকার স্থানকে কিভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত কযুক্তরাষ্ট্রের দুটি জায়গায় প্রায় ৬২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচে এ রকম দুটি টানেল স্থাপন করা হয়। ২০১৬ সালে সেখানে প্রথমবার মহাকর্ষ তরঙ্গ শনাক্ত করেন বিজ্ঞানীরা। প্রায় ১০০ বছর আগে এমন তরঙ্গের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন আইনস্টাইন। তবে এখান থেকে মহাকর্ষ কীভাবে কাজ করে, সে ব্যাপারে কোনো কোয়ান্টাম চিত্র পাওয়া যায় না। কারণ, মহাকর্ষ তরঙ্গ আর মহাকর্ষ কণা বা গ্র্যাভিটন এক জিনিস নয়। তবু একে অনেক বড় ধরনের আবিষ্কার বলতেই হবে (সূত্রঃ বিজ্ঞনচিন্তা)।
উল্লেখ্য, আমরা খোলা আকাশের নীচে বায়ুর প্রবল উর্ধ্বচাপের সম্মুখীন। পানিতে রয়েছে পানির উর্ধ্বচাপ। প্রবল ঘূর্ণঝড়ের সময়ও গাছপালা, ঘর-বাড়ি উড়িয়ে নিয়ে গেলেও মানুষ তো দূর;আরও বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, আমাদের যানবাহন যখন পাহাড়ের উর্ধ্বমুখী ঢালু বেয়ে সজোরে নিম্নমুখী রাস্তার কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছার পর কিংবা বেঁকে যাওয়া রাস্তার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার পর সামনে অগ্রসররত গাড়ীর চাকা মাটি আকঁড়ে নিম্নমুখী রাস্তা দিয়ে চলে কেন? মাটি ছাড়িয়ে শুন্যে চলে না কেন? এর বৈজ্ঞানিক কারণ কি হতে পারে? যেমন বেঁকে যাওয়া রেল লাইন দিয়ে ট্রেন সজোরে চল্লেও চাকা রেললাইনকে আঁকড়ে থাকে-যার একটা বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে।
মহাকর্ষ সম্পর্কিত পুনরালোচনা
►“আমরা জানি, আমাদের চারপাশের জগতে এই বলটা কাজ করছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না এই বলটা অদ্ভুত। জাত-ধর্মেও অন্যদের চেয়ে আলাদা। অসামাজিক। কারণ, মহাবিশ্বের অন্যান্য মৌলিক বলের প্যাটার্নের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের কোনো মিল নেই। প্রথমত, অন্যান্য বলের তুলনায় মহাকর্ষ খুবই দুর্বল। আবার এই বল কখনো বিকর্ষণ করে না, সব সময় আকর্ষণ করে”। শুধু কি তাই, কোয়ান্টাম জগতের সঙ্গেও এই বলকে খাপ খাওয়ানো যায
►“সবকিছুকে কোনো প্যাটার্নে খাপ খাওয়ানোর ইচ্ছা পদার্থবিদদের অনেক দিনের। এর একটি কারণ, তাঁরা পদার্থবিজ্ঞানের সবকিছুকে একত্র করে একটিমাত্র তত্ত্বের ভেতরে আনতে চান। অর্থাৎ একটিমাত্র তত্ত্ব দিয়ে মহাবিশ্বের সবকিছু ব্যাখ্যা করতে চান তাঁরা। একে বলা হয় থিওরি অব এভরিথিং বা সবকিছুর তত্ত্ব। এই চাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা মহাকর্ষ।
► “আবার অন্য মৌলিক বলগুলোর সঙ্গে মহাকর্ষের খাপ না খাওয়ার ব্যাপারটাও বেশ রহস্যময়। বিজ্ঞানীদের জন্য হতাশাজনকও বটে। কারণ, বিজ্ঞানীরা সবকিছুতে প্যাটার্ন খোঁজেন। অপরূপ মহাবিশ্বের বিচিত্রতা ও জটিলতা দেখলে অভিভূত না হয়ে আমাদের উপায় থাকে নকারো চেহারা দেখে কিংবা প্রোফাইল দেখলে যতটা না চেনা সম্ভব, তার চেয়ে বেশি চেনা বা বোঝা যাবে তার ইন্টারনেট ব্রাউজিং হিস্ট্রির প্যাটার্ন পরীক্ষা করলে, কম্পিউটারের আলগরিদের সূত্রের ধাঁচে । বিজ্ঞানীরা এভাবে মহাবিশ্বকে বোঝার বা ব্যাখ্যার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বটে। কিন্তু এই চেষ্টা করতে গিয়ে দেখা গেছে, মহাকর্ষ অন্য সব বলের কোনো প্যাটার্নের সঙ্গেই খাপ খাচ্ছে না। বিষয়টি বড়ই বিস্ময়কর বটে!
মহাকর্ষ বল না থাকলে কী হত?
উল্লেখ্য, মহাকর্ষ বল না থাকলেও গ্রহ নক্ষত্র গঠন হতে পারতো কিন্ত্ত তারা পরে পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে ধ্বংস হয়ে যেতো । এতে প্রতীয়মান যে, শুধু বস্ত্ত গঠনে মহাকর্ষের তেমন ভুমিকা নেই, ভূমিকা রয়েছে বস্ত্তর সংরক্ষণে। ( সূত্রঃ https://bn.quora.com/অভিকর্ষ-এক-ধরনের-মহাকর্ষ-বল)।
স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে মহাকর্ষকে বাদ দেওয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ
মহাকর্ষকে স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে বাদ দেওয়ার কতিপয় বৈজ্ঞানিক কারণ দেখা যায়ঃ
দুর্বল ও সবল বল কাজ করে কেবল অতিক্ষুদ্র পরিসরে কোয়ান্টাম জগতে । কাজেই এ দুটি বলের সিংহভাগই শুধু অতিপারমাণবিক কোয়ান্টাম পরিসরে উপলব্ধি করা যায়। ফলে, বড় পরিসরে অর্থাৎ গ্রহ, নক্ষত্র ও ছায়াপথের চলাফেরায় বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের বড় কোনো ভূমিকা নেই। এর কারণ, বিদ্যুৎ–চৌম্বকীয় বলের সঙ্গে দ্বিমুখী ধনাত্মক ও ঋণাত্মক এই দুই ধরনের পারমাণবিক বৈদ্যুতিক চার্জ জড়িত থাকা। একই কারণে বৃহৎ পরিসরে দুর্বল ও সবল পারমাণবিক বলেরও ভূমিকা নেই- যাদের বৈদ্যুতিক চার্জের মতো দ্বিমুখী (হাইপারচার্জ ও কালার) ধর্ম রয়েছে। এগুলোর মানও ভিন্ন ভিন্ন।
পক্ষান্তরে বড় পরিসরে মহাকর্ষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার বিপুল ভরের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ এই বল। মহাকর্ষ একমুখী। তাই মহাকর্ষ শুধু বস্তুকে আকর্ষণ করে বা টানে, বিকর্ষণ করে না। অন্যদিকে মহাকর্ষের মান সংশ্লিষ্ট বস্তুর ভরের সঙ্গে সম্পর্কিত। অবশ্য মহাকর্ষকেও অন্য বলগুলোর মতো ভাগ করা যায়। অর্থাৎ বস্তুর ভরকে মহাকর্ষের চার্জ হিসেবে কল্পনা করা যায়, যার মাধ্যমে বস্তুটি কতটুকু মহাকর্ষ অনুভব করবে, তা নির্ধারিত হবে।
কিন্তু সমস্যা হলো, মহাবিশ্বে শুধু এক ধরনের ভরই দেখা যায়। ঋণাত্মক বা নেগেটিভ ভর বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। কাজেই কোনো কণা বা বস্তুকে মহাকর্ষ বিকর্ষণ করে না। এটা মহাবিশ্বের বস্তু জগতে অভূতপূর্ব এবং আইনস্টাইনের স্বপ্নিল সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্বের প্রতিকূল বা প্রতিবন্ধক। যার কারণে মহাকর্ষের মতো এত বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেলে বিবেচনা করা সম্ভবপর হচ্ছে না। সম্ভব হয়নি মহাকর্ষের স্বপ্নদ্রষ্টা নিউটন কিংবা আইনস্টাইন- কাউকে নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত করাও।
এখনও পর্যন্ত মহাকর্ষের কোনও কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব তৈরি করা সম্ভব হয় নি। মহাকর্ষের তত্ত্ব মূলতঃ আইনস্টাইনের ‘সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের উপর ভিত্তিশীল। যদিও আইনস্টাইনীয় এই ক্ষেত্রতত্ত্ব অপূর্ব গাণিতিক যৌক্তিকতা সমৃদ্ধ এবং অসাধারণ সফল একটি তত্ত্ব (অর্থাৎ বিগত এক শতাব্দীর অজস্র সঠিকভাবে সম্পাদন করা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাথে এই তত্ত্বের দেওয়া ফলের কখনও কোনও গরমিল হয়নি) তথাপি যেহেতু সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব একটি সনাতন ক্ষেত্রতত্ত্ব সেহেতু এর মধ্যে ক্ষুদ্র জগতের নিয়মাবলী অর্থাৎ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়মগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি কিংবা সম্ভব হয়ন। ফলে প্রকৃতির সেই সমস্ত পরিসর যেখানে একটি অতিপারমাণবিক ক্ষুদ্র অঞ্চলে রয়েছে বিগ ব্যাং পূর্ব হাইয়েস্ট এনার্জেটিক রেডিয়েশন (উচ্চশক্তি বিকিরণ তত্ত্ব), তা বিস্ফোরণোত্তর বিগ ব্যাং তত্ত্ব, ব্ল্যাকহোল ও তার সিঙ্গুলারিটি বা ইভেন্ট হরিজন (ঘটনাদিগন্ত) এবং তীব্র মহাকর্ষ- বহুবিধ বিষয় সংশ্লিষ্টতার ফলে সাধারণ আপেক্ষিকতা তাত্ত্বিক মহাকর্ষকে গাণিতিক কারণে বাদ দেয়া হয়েছে মডার্ণ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেল থিওরি থেকে।
উল্লেখ্য, কণা পদার্থবিদ্যার স্ট্যান্ডার্ড মডেল পুরোপুরি কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব-নির্ভর একটি মডেল। ফলে মহাকর্ষ সেখানে অনুপস্থিত”।(সূত্রঃhttps://bn.quora.com/topic/মহাকর্ষ-ও-অভিকর্ষ)“
থেমে নেই মহাকর্ষ গবেষণা !
তাত্ত্বিক কারণে মহাকর্ষ কসমোলজিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে বাদ পড়লেও মহাবিশ্বের অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির অআলোচনা থেমে নেই। চলছে নিরন্তন গবেষণা।
এখন সারা বিশ্বে বিপুল গবেষণা চলছে মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্ব আবিষ্কারের জন্য। এই বিষয়ে সবচেয়ে অগ্রণী তত্ত্বটি হল M-তত্ত্ব যা আসলে ৫ টি ভিন্ন সুপারস্ট্রিং তত্ত্বের একীকরণ (তবে এখনও অসম্পূর্ণ)। সুপারস্ট্রিং তত্ত্বগুলি আবার নিজেরা স্ট্রিংতত্ত্ব ও সুপারগ্র্যাভিটি তত্ত্বের সমন্বয়। সুপারগ্র্যাভিটি তত্ত্ব হল সাধারণ আপেক্ষিকতা আর সুপারসিমেট্রির সমন্বয়। এর মধ্যে সাধারণ আপেক্ষিকতা একটি প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব কিন্তু সুপারসিমেট্রি-র উপস্থিতির কোনও প্রমাণ এখনও প্রকৃতিতে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া স্ট্রিং-এর উপস্থিতিরও কোনও পরীক্ষামূলক প্রমাণ এখনও পর্যন্ত নেই (বা সেইরকম পরীক্ষা করার মত প্রযুক্তিও এখনও নেই)। এগুলি সবই এখনও পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে গাণিতিক”।
উল্লেখ্য, কণাজগতে উপস্থিত তিনটি কোয়ান্টাম বল (অর্থাৎ যাদের কোয়ান্টাম তত্ত্ব ইতিমধ্যে তৈরি করা গেছে)- তড়িৎচুম্বকীয়, দুর্বল বল ও সবল বল- এদের তুলনায় মহাকর্ষ অকল্পনীয় রকমের দুর্বল। একটি সহজ উদাহরণ থেকেই এটা বোঝা যায়ঃ গোটা পৃথিবীর টান উপেক্ষা করে একটি ছোট চুম্বক একটি লোহার পেরেককে তুলতে পারে। সেইজন্য কণাজগতের বেশীরভাগ ঘটনাবলীতে মহাকর্ষের প্রভাব নগণ্য। ফলে মহাকর্ষবিহীন স্ট্যান্ডার্ড মডেল (ও সংশ্লিষ্ট কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব) বেশীরভাগ কণাজাগতিক ঘটনাবলী অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করতে পারে। কেবল সেইসব পরিসর যেখানে মহাকর্ষ ক্ষুদ্র অঞ্চলে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে ওঠে সেখানে স্ট্যান্ডার্ড মডেল অচল হয়ে পড়ে।
আমরা জানি, আমাদের চারপাশের জগতে এই বলটা (Force) কাজ করছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না যে, এই বলটা বড়ই অদ্ভুত। জাত-ধর্মেও অন্য বলের চেয়ে আলাদা। কারণ, মহাবিশ্বের অন্যান্য মৌলিক বলের প্যাটার্নের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সেগুলোর সঙ্গে অদ্ভূত বলটির কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আজ পর্যন্ত। তাছাড়া, অন্যান্য বল (Force) এর তুলনায় মহাকর্ষ বলটি খুবই দুর্বল। আবার এই বলের বড়মাপের স্বভাব হচ্ছে, বলটি কখনো বিকর্ষণ করে না, সব সময় আকর্ষণ করে। শুধু কি তাই, কোয়ান্টাম জগতের সঙ্গেও এই বলকে খাপ খাওয়ানো যায় না। এসব কারণেই সত্যিই মহাকর্ষ (Gravitation): মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় !
ডার্ক ফোটনঃ নতুন মহাকর্ষের পথে মহাবিশ্ব!
২০১২ সাল। হাঙ্গেরিয়ান পদার্থবিজ্ঞানের গবেষকরা ছিলেন ভীষণ উদ্দীপ্ত, উত্ফুল্ল। সেই গবেষকদের দলের নেতৃত্বে ছিলেন ডেব্রেসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টারের পদার্থবিদ আত্তিলা কার্জন্যাহরকে। একটা ছোট্ট সাধারণ কণা ডিটেক্টর নিয়ে কাজ করছিলেন তাঁরা। হঠাৎ ডিটেক্টরে অন্য রকম একটা কণার সন্ধান পান বিজ্ঞানী দল। প্রাপ্ত কণাটি ছিল খুব হালকা। ভর ৩৪টি ইলেকট্রনের সমান। সেটার চরিত্র বোঝার জন্য চলল তথ্য-উপাত্ত নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু পদার্থবিদ্যার যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল, তাতে যে কটি কণা ঠাঁই পেয়েছে, তার কোনোটির সঙ্গেই মেলে না কণাটির চরিত্র। তার মানে, স্ট্যান্ডার্ড মডেলের চেনা-জানা গণ্ডির বাইরের কোথাও থেকে যেন হাজির হয়েছে কণাটি! যাকে বলা যেতে পারে স্ট্রেন্জ কোয়ার্ক কিংবা অদ্ভূতুড়ে নিউট্রিনোর ন্যায় স্ট্রেন্জ পার্টিকেল অথবা স্ট্রেন্জ ফোর্স বা (অদ্ভূতুড়ে কণা কিংহাঙ্গেরিয়ান পদার্থবিজ্ঞানের গবেষকরা বারংবার পরীক্ষার ফলাফল পাচ্ছিলেন অভিন্ন। ফলে শেষমেশ বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে এলেন, এটাই সম্ভবতঃ বহুল প্রত্যাশিত “ডার্ক ফোটন” যা হয়তো হতে যাচ্ছেঃ নতুন বিকল্প মহাকর্ষ বল! হতে পারে এই নতুন বল অজানা ডার্ক ম্যাটার (গুপ্ত বস্তু আর ডার্ক এনার্জির (গুপ্ত শক্তি) রহস্য উদঘাটনে সহায়ক হবে। কারণ, সেই ডার্ক ম্যাটারের ব্যাখ্যার জন্য মহাবিশ্বে একধরনের বলের দরকার হয়। সেই বলের জন্য দায়ী যে কণা, সেটাই সম্ভবতঃ প্রস্তাবিত এই ডার্ক ফোটন! তার মানে, ডার্ক ফোটন হতে যাচ্ছে মহাবিশ্বের ৫ম মহাবউল্লেখ্য, মহাবিশ্বে আরও তিনটি বল সক্রিয়। সবল নিউক্লীয় বল, দুর্বল নিউক্লীয় বল আর মহাকর্ষ বল। সবল নিউক্লীয় বল ক্রিয়া করে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ভেতর। নিউক্লিয়াসে ধনাত্মক চার্জযুক্ত প্রোটন আর চার্জ নিরপেক্ষ নিউট্রন অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে যুক্ত থাকে। তাদের এই শক্তিশালী বন্ধনের পেছনে সম্পূর্ণ নতুন এক বল কাজ করে। বিজ্ঞানীরা এই বলের নাম দিলেন সবল নিউক্লীয় বল। চার বলের মধ্যে এই বলই সবচেয়ে শক্তিশালী। কিন্তু পাল্লা খুব কম। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যেই এর যত জারিজুরি। তার বাইরে নয়। কিন্তু এই বলের জন্য দায়ী কোনো কণা আছে কি? বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মেসন নামের একধরনের কণা এই বলের বাহক হিসেবে কাজ করে। পরে তাঁরা জানতে পারেন, মেসন নিজেই মূল কণিকা নয়। এগুলো কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি। মূল কণিকা নয় নিউট্রন কিংবা প্রোটনও। এরাও কোয়ার্ক তৈরি দিয়ে। নিউট্রন, প্রোটন আর মেসনের ভেতরে কোয়ার্কগুলোকে আটকে রাখে গ্লুয়ন নামের বলবাহী কণা। এই গ্লুয়নই সবল নএক পরমাণুর নিউক্লিয়াস ভেঙে পরিণত হয় আরেকটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যার পেছনে কাজ করে দুর্বল নিউক্লীয় বল। এই দুর্বল নিউক্লীয় বলের বাহক হলো W+, W- ও Z0 নামের তিনটি চারটি বলের মধ্যে মহাকর্ষ সবচেয়ে দুর্বল। এর আকর্ষণ ক্ষমতা খুবই কম। কিন্তু বিস্তার অনেক বেশি, অসীম পর্যন্ত। এই বলের জন্য নিউটন বলেছিলেন বস্তুর ভর দায়ী। কিন্তু বস্তুর সেই ভরটা কোথায় থাকে, সেটা আজও মস্ত এক রহস্য। আইনস্টাইন বলেছিলেন, মহাকর্ষ হলো স্থান-কালের বক্রতার ফল। ভারী বস্তু তার চারপাশের স্থান-কাল বাঁকিয়ে দেয়। সেই বাঁকানো স্থান-কালের ভেতর আরেকটি বস্তু এসে পড়লে মনে হয়, বস্তু দুটো পরস্পরকে আকর্ষণ করছে।
পদার্থবিজ্ঞানের নিউটন-অইনস্টাইনীয় শাখার বিকল্প কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞা খুদে কণিকাদের জগতে এই বল কাজ করে না। আবার খুদে কণিকারা চিরায়ত বলবিদ্যার কোনো সূত্রই মানে না। তাই এদের জন্য তৈরি হয়েছে পদার্থবিদ্যার আরেকটা শাখা কোয়ান্টাম বলবিদ্যা।যাতে সেই বলবিদ্যা দিয়ে মহাবিশ্বের পুরোটা আবার ব্যাখ্যা করা যায়।
বৃহৎ পরিসরি বস্তুর প্রকৃতি ব্যাখ্যায় আজও নিউটন-আইনস্টাইনের বলবিদ্যাই কার্যকর
মহাবিশ্বের সৃষ্টিরহস্য ব্যাখ্যার জন্য ১৯৭০-এর দশকে তিন পদার্থবিদ স্টিভেন ওয়েনবার্গ, আবদুস সালাম ও শেলডন গ্ল্যাশো স্ট্যান্ড্যার্ড মডেল দাঁড় করান। সেই মডেলে স্থান পায় সব মূল কণিকার। বোসন আর ফার্মিয়ন এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করে। ফার্মিয়ন শ্রেণির কণাগুলো সাধারণ বস্তুকণা আর বোসন কণাগুলো হলো বলবাহী কণা। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলে মহাকর্ষ বলের স্থান কোথায়? এটার সমাধান আজও হয়নি। তবে কণা পদার্থবিদেরা একটা হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছেন। বলেছেন, এক কল্পিত বলবাহী কণার কথা, সেটা গ্র্যাভিটন। সেটার কারণেই নাকি বস্তু মহাকর্ষ বল অনুভব করে। কিন্তু সেই বলবাহী কণার দেখা আজও পাননি বিজ্ঞান।
চার বলই কি নিয়ন্ত্রণ করছে গোটা মহাবিশ্ব ?
এখন যে প্রশ্নটা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, এই চার বলই কি নিয়ন্ত্রণ করছে গোটা মহাবিশ্ব। তা হয়তো নয়। কারণ, মার্কিন বিজ্ঞানী ভেরা রুবিনের একটা তত্ত্ব প্রমাণ করে বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে ৪ বল যথেষ্ট নয়। এ সম্পর্কে ১৯৭০-এর দশকে এই মার্কিন জ্যোতির্বিদ শোনালেন, এক আশ্চর্য কথা।
রুবিন জানান, মহাবিশ্বের মোট ভরশক্তির খুব সামান্য অংশই আমাদের কাছে ধরা দিয়েছে, বড়জোর মাত্র ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫/৯৬ শতাংশই রয়ে গেছে গুপ্ত (ডার্ক) অবস্থায়। আমাদের প্রচলিত পদার্থবিদ্যার জ্ঞান দিয়ে আপাতত সেগুলোর হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। পরে বিজ্ঞানীরা একটা তথ্য বের করতে পারলেন। সেই গুপ্ত ভরশক্তির ৬৮/৬৯ শতাংশ গুপ্ত শক্তির (Dark Energy) আকারে থাকে, বাকি ২৬/২৭ শতাংশ গুপ্ত পদার্থ (Dark Matter)।
ডাচ বিজ্ঞানী ইয়ান ওর্ট ও মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রিত্জ জুইকি কর্তৃক মহাকাশ অদৃশ্য এক নতুন মহাকর্ষ বলের সন্ধান লাভের ইতিকথা
১৯৩০-এর দশক। ডাচ বিজ্ঞানী ইয়ান ওর্ট ও মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রিত্জ জুইকি মহাকাশে অদৃশ্য এক মহাকর্ষ প্রভাবের সন্ধান পেলেন। সেই মহাকর্ষীয় প্রভাবের জন্য মহাবিশ্বের কোনো বস্তুই দায়ী নয়। অচেনা বস্তু থেকে তৈরি সেই মহাকর্ষ বলের প্রভাব অনেক অনেক বেশি। তবে কি তাঁদের হিসাবে ভুল ছিল? প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা সেটা নিয়ে তেমন মাথা ঘামাননি। ১৯৫৯ সাল, জ্যোতির্বিদ লুইস ভোল্ডারসের আরেকটি গবেষণা বিষয়টা নিয়ে আবার ভাবিয়ে তুলল বিজ্ঞানী মহলকে। এরপরই ভেরা রুবিন সেটা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই বিশাল পরিমাণ ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জিকে আমলে নিয়েই বিগ ব্যাং, মহাবিশ্বের প্রসারণ ইত্যাদি বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা যায়। ব্যাখ্যা করা যায় আইনস্টাইএকটি অদৃশ্য বল নিয়ন্ত্রণ করছে গোটা গুপ্ত ভরশক্তির জগতকে !বিশ্বব্যাপী ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চলছে চার দশক ধরে। কিন্তু এদের সন্ধান মেলেনি। বিজ্ঞানীরা দৃশ্যমান জগতের মতো ডার্ক ম্যাটার আর ডার্ক এনার্জিও নিয়ে একটা বৈজ্ঞানিক সিস্টেম তৈরি করতে চাচ্ছেন। এরই প্রথম প্রয়াস হাঙ্গেরিয়ান বিজ্ঞানীদের এই ডার্ক ফোটনীয় তত্ত্ব। তাঁরা মনে করেন, বিদ্যুৎ-চুম্বকীয় বল যেমন আমাদের চেনাজানা মহাবিশ্বকে দৃশ্যমান করছে, এর সম্পূর্ণ পরিচিতি তুলে ধরেছে আমাদের সামনে, তেমনি একটি বল নিয়ন্ত্রণ করছে গোটা গুপ্ত ভরশক্তির জ হাঙ্গেরিয়ান বিজ্ঞানীরা গুপ্তজগতের সেই বলটিকেই বলছেন ডার্ক ফোর্স বা গুপ্তবল, যা নাকি মহাবিশ্বের পঞ্চম বল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ৫ম কোনো বল যদি থাকে তাহলে সেই বলের বাহকেরও দরকার। অর্থাৎ এর জন্যও একটা বলবাহী কণা থাকতে হবে।
প্রস্তাবিত পঞ্চম বল ডার্ক ফোটন হতে যাচ্ছে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মিসিং লিংক !
হাঙেরিয়ান গবেষকদের দাবীঃ রহস্যময় কণাটি আসলে ডার্ক ফোর্সের বাহক। তাঁরা ২০১৫ সালে আবার একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তাতে তাঁরা দাবি করেন, পঞ্চম এই বল আর ডার্ক ফোটনই হবে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মিসিং লিংক।ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একদল গবেষক হাঙ্গেরিয়ান বিজ্ঞানীদের গবেষণার ফলটিকে যাচাই করে দেখেন। তাঁরা এতে “কোনো খুঁত খুঁজে পাননি”- এ কথা তাঁরা ফলাও প্রচার করার পর সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা যথেষ্ট অনুপ্রাণিত হয়ে পঞ্চম বল তথা ডার্ক ফোটন নিয়ে বিশ্বের বড় বিজ্ঞানীরা গবেষণায় উৎসাহিত হচ্ছেন হাঙ্গেরিয়ান বিজ্ঞানীদের গবেষণার বাস্তবতা উদ্ধার বা প্রমাণের জন্য। হয়ত নতুন করে ভাবা হবে ৫ম ডার্ক ফোটন বলের সাথে ৪র্থ মহাকর্ষের মিথস্ক্রিয়া তথা প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। হতে পারে তা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
লাইগো (LIGO) দিয়েছে মহাকর্ষ তরঙের খবর, এবার দেবে কোয়ান্টাম মহাকর্ষের খবর!
১৯১৫ সালে আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা প্রকাশ করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল নিউটনের মহাকর্ষের ত্রুটিগুলো দূর করে নতুন একটা মহাকর্ষ তত্ত্ব দাঁড় করানো। এ জন্য তিনি মহকর্ষীয় ক্ষেত্রতত্ত্বের জন্ম দেন।
আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রতত্ত্বে ব্ল্যাকহোলী ভূত না রক্ষস!
জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জশিল্ড সেই ক্ষেত্রতত্ত্বের সমাধান করতে গিয়ে পেলেন সূর্যের চেয়ে কমপক্ষে তিন গুণ ভারী এক নক্ষত্রের যা আয়ুস্কাল ফুরিয়ে রূপ নেয় এক ভয়ংকর চেহারায়। যার বৈজ্ঞানিক নাম ব্ল্যাক হোল। এই ব্ল্যাকহোলী ভূতের সন্ধান পেয়ে শোয়ার্জশিল্ড নিজেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। পরে জানা গেল এ ভূত নয় কেবল, যেন জলজ্যান্ত রাক্ষস যা কিনা রীতিমত আলোকে পর্যন্ত গএ ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়ে শোয়ার্জশিল্ড বলেন, ভেতরের জ্বালানি ফুরিয়ে এলে খুব দ্রুত চুপসে যেতে শুরু করে ভারী নক্ষত্র। ভেতরের পদার্থগুলো খুব কাছাকাছি এসে পড়ে। দ্রুত বাড়তে থাকে নক্ষত্রের ঘনত্ব। পাল্লা দিয়ে বাড়ে নক্ষত্রটির মহাকর্ষ বলও। একসময় একেবারে চুপসে গিয়ে নক্ষত্রটি একটা বিন্দুর আকার ধারণ করে। আমাদের এই পৃথিবী যদি কোনোভাবে ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতো, তাহলে এর ব্যাসার্ধ হতো মাত্র দশমিক ৮৭ সেন্টিমিটার, ১৩ লক্ষ গুণ বড় সূর্যের ক্ষেত্রে ব্যাসার্ধটা দাঁড়াত সাড়ে ৫ সেন্টিমিনক্ষত্র ব্ল্যাকহোলে পরিণত হলে তার আয়তনটা শুধু কমে এতটুকু হয়ে যায় বটে তবে ভর কমে না এক ফোঁটাও। রীতিমতো ভয়ংকর হয়ে ওঠে তার মহাকর্ষ বল। মহাকর্ষক্ষেত্রের মুক্তিবেগ আলোর বেগের চেয়ে বেশি হওয়ায় আলো চাইলেও ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এমন রাক্ষুসে মহাকর্ষ টান যে বস্তুর, আলোও যার থেকে রেহাই পায় না। একে বলা যেতে পারে মহাজাগতিক ভূত। যা রূপকথার রাক্ষসকেও হার মানায় বৈকি।
কোয়ান্টাম মেকানিকস
যাহোক ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য বিজ্ঞানীদের হাতে থাকে অন্ধের সাদাছড়ির ন্যায় একটা বৈজ্ঞানিক সাদাছড়ি যাকে বলা হয় কোয়ান্টাম মেকানিকস।
কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন
কোয়ান্টাম মেকানিকস বা কণাবাদী বলবিদ্যা দাঁড়িয়ে আছে আবার অনিশ্চয়তা তত্ত্বের ওপর। গত শতাব্দীর কুড়ির দশকে যেটা দাঁড় করিয়েছিলেন জার্মান পদার্থবিদ ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ। সেই তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেই বেরিয়ে আসে আরেকটা তত্ত্ব। নামঃ কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন। এই তত্ত্ব বলে, শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়। তার ভেতর লুকিয়ে আছে শক্তি। সেই শক্তির জোগান দেয় ভার্চ্যুয়াল কণা ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাক দিলেন এক আশ্চর্য কণার খোঁজ। বললেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার একটি করে প্রতিকণা থাকবে। সাধারণ কণা আর তার প্রতিকণার ভর সমান, কিন্তু হবে চার্জ উল্টো।
উল্লেখ্য, ইলেকট্রন আর পজিট্রনের ভর সমান। কিন্তু পজিট্রনের চার্জ ধনাত্মক। তেমনি প্রোটনের আর অ্যান্টিপ্রোটনের ভর সমান কিন্তু প্রোটন ধনাত্মক আর অ্যান্টিপ্রোটনের চার্জ ঋণাত্মক। নিউট্রনের চার্জ নেই, তবু এর প্রতিকণা অ্যান্টি-নিউট্রন আছে। সেটা সম্ভব হয়েছে কোয়ার্কের কারণে। প্রতি-কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি হওয়া নিউট্রনই আসলে প্রতি-নিউট্রন। এক জোড়া কণা আর প্রতিকণা পরস্পরের সংস্পর্শে এলে দুটোই ধ্বংস হয়ে যায়। পড়ে থাকে শুধু শক্তি, আলো বা ফোটআসলে শূন্যস্থানে সব সময় এই কণা-প্রতিকণার সৃষ্টি আর ধ্বংসের খেলা চলছে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, প্রতি মুহূর্তে সব জায়গায় তৈরি হচ্ছে কণা আর প্রতিকণার জোড়া। কিন্তু তারা খুব ক্ষণস্থায়ী। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই এরা পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। পড়ে থাকে শক্তি। সেই শক্তিই পরক্ষণে আবার এক জোড়া কণা-প্রতিকণা তৈরি করে। এভাবেই প্রকৃতিতে চলছে ভার্চ্যুয়াল কণাদের ভাঙাগড়ার খেলা। এই ভার্চ্যুয়াল কণাগুলোই হদিস পাইয়ে দেয় ব্ল্যাকহোলের।
শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ
শোয়ার্জশিল্ড দেখিয়েছিলেন, কৃষ্ণগহ্বরের ব্যাসার্ধ খুব ছোট। কিন্তু তার আকর্ষণসীমা অতটা ছোট নয়। মূল কৃষ্ণগহ্বর আসলে ছোট্ট বিন্দু, যেটাকে বলে সিঙ্গুলারিটি। এর বাইরে কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষক্ষেত্র। সেটা কয়েক কিলোমিটার ব্যাসের একটা বৃত্ত হতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র যেখানে শেষ, সেটাকে বলে ঘটনা দিগন্ত (Event Horizon)। কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্র থেকে ঘটনা দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ব্যাসার্ধকে বলা হয় শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ। এই ব্যাসার্ধের বাইরে অর্থাৎ ঘটনা দিগন্তের বাইরে কৃষ্ণগহ্বরে কোনো আকর্ষণ বল কাজ করে না। তাই বিজ্ঞানীরা উপলদ্ধি করেন নতুন ধরণের কোয়ান্টাম মহাকর্ষের।
কোয়ান্টাম মহাকর্ষের (Quantum Gravity) দরকার কেন?
ঘটনা দিগন্তের খুব কাছে তৈরি হয় ভার্চ্যুয়াল কণার জোড়া। এরা পরস্পরকে ধ্বংস করার আগেই একটা কণা পড়ে যায় ঘটনা দিগন্তের ভেতরে। অন্য কণাটা ঘটনা দিগন্তে নাও পড়তে পারে। বেরিয়ে যেতে পারে মহাশূন্যে। এই কণাটিই তখন কৃষ্ণগহ্বর থেকে শক্তির জোগান পায়। সেই শক্তির বিকিরণের ফলে কণাটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ঘটনা দিগন্তের বাইরে তখন তৈরি হয় বিকিরণ বলয়। এ ধরনের বিকিরণকে বলে হকিং বিকিরণ। কিন্ত্ত সেই বিকিরণ বলয় দেখেই ব্ল্যাকহোলের হদিস মেলে সত্য, কিন্তু ব্ল্যাকহোলের ভেতরের খবর মেলেনি আজও। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, একটা সম্ভাবনা আছে। তবে সেটা আইনস্টাইনের মহাকর্ষ তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার হবে কোয়ান্টাম মহাকর্ষের (Quantum Gravity)।
আশার আলো দেখাচ্ছে লাইগো (LIGO)
কিন্তু কোয়ান্টাম মহাকর্ষের পূর্ণাঙ্গ তত্ত্ব বা ব্যাখ্যা কোনোটাই এখনো আবিষ্কার করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে লাইগো (LIGO), যে যন্ত্র থেকে ২০১৬ সালে হদিস মিলেছে মহাকর্ষ তরঙ্গের। এর শত বর্ষ পূর্বে ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন রচনা করেছিলেন মহাকর্ষভিত্তিক সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। আইনস্টাইন চেষ্টা করেছিলেন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা আর কোয়ান্টাম মেকানিকসকে একত্র করতে। কিন্তু সফল হননি। এখনকার বিজ্ঞানীরা বলছেন, মহাকর্ষ তরঙ্গের প্রতিধ্বনিই দেবে কোয়ান্টাম মহাকর্ষের খোঁজ। সুতরাং তখন আর কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরের খবর পাওয়া কঠিন হবে না।
কোয়ান্টাম মহাকর্ষের যে আশার বাণী শুনিয়েছেন কানাডার ওয়াটার লুর পেরিমিটার ইনস্টিটিউট অব থিওরিটিক্যাল ফিজিকসের তিন তরুণ বিজ্ঞানী !
২০১৭ সালের শুরুর দিকে লাইগোতে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কোয়ান্টাম মহাকর্ষের আশার বাণী শুনিয়েছেন কানাডার ওয়াটার লুর পেরিমিটার ইনস্টিটিউট অব থিওরিটিক্যাল ফিজিকসের গবেষক জাহেদ আবেদি, হান্নাহ ডাইকার ও নাইয়েশ আশরফদি নামক তিন তরুণ বিজ্ঞানী। তিন গবেষক একটা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে বলছেন, ব্ল্যাকহোল থেকে আসা মহাকর্ষ তরঙ্গের প্রতিধ্বনি বিশ্লেষণ করে বের করা যেতে পারে কৃষ্ণগহ্বরের ভেতরের খবর। সেটা করতে গিয়েই হয়তো পাওয়া যেতে পারে ৪র্থ আইনস্টাইনীয় মহাকর্ষ বল কিংবা ৫ম কোয়ান্টাম মহাকর্ষ বল যা হতে পারে আইনস্টাইনের স্বপ্নিল সার্বিক একীভূতকরণ তত্ত্ব। তাই যদি হয়, তাহলে বহুদিন ধরে ঝুলে থাকা বৈজ্ঞানিক রহস্যগুলোর সমাধান পেয়ে যেতে পারি অচিরেই ইনশা আল্লাহ।